শেষ আশ্রয়
মানুষের জীবনে কিছু স্মৃতি কখনো পুরোনো হয় না। সময়ের সঙ্গে মানুষ বদলে যায়, গ্রাম বদলে যায়, পরিচিত দৃশ্যগুলোও একসময় হারিয়ে যায়। কিন্তু কিছু কিছু জিনিস স্মৃতির ভেতর এমনভাবে বেঁচে থাকে, যেন তারা এখনও আমাদের চোখের সামনেই দাঁড়িয়ে আছে। আমার জীবনে তেমনই একটি স্মৃতি হলো গ্রামের সেই বিশাল বটগাছ।
আমার গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয় ছিল বাড়ি থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে। প্রতিদিন স্কুলে যেতে হতো সরু আইলের পথ ধরে। দুই পাশে বিস্তৃত ধানক্ষেত, মাঝে মাঝে ছোট ছোট খাল, আর একটি সরু নদীর ওপর বাঁশের সাঁকো পার হয়ে পৌঁছাতে হতো স্কুলে।
পথের শুরুতেই বৈদ্যপাড়ায় দাঁড়িয়ে ছিল একটি বিশাল বটগাছ। গ্রামের মানুষ তাকে শুধু একটি গাছ হিসেবে দেখত না। সে ছিল গ্রামের এক নীরব অভিভাবক। বয়স্ক মানুষদের মুখে শুনেছি, তাদের শৈশবেও নাকি গাছটি এমনই বিশাল ছিল। তাই অনেকের বিশ্বাস ছিল, গাছটি গ্রামের চেয়েও পুরোনো।
অসংখ্য ঝুরি, বিস্তৃত ডালপালা আর বিশাল ছায়া নিয়ে সে যেন একটি জীবন্ত পৃথিবী ছিল। দূর থেকে দেখলে মনে হতো, একা একটি গাছ নয়, বরং একটি ছোট্ট বন দাঁড়িয়ে আছে।
আমাদের শৈশবের কত আনন্দ যে সেই বটগাছকে ঘিরে ছিল, তার হিসাব নেই। স্কুল থেকে ফেরার পথে আমরা ঝুরি ধরে দোল খেতাম। কখনও লুকোচুরি খেলতাম, কখনও বন্ধুদের সঙ্গে বসে গল্প করতাম। গাছটির ছায়া ছিল আমাদের ছোট্ট জগতের সবচেয়ে প্রিয় ঠিকানা।
গ্রীষ্মের দুপুরে মাঠে কাজ করা কৃষকেরা এসে সেখানে বিশ্রাম নিতেন। পথচলতি মানুষ কিছুক্ষণ বসে ক্লান্তি দূর করতেন। গরু-ছাগলও রোদের তাপ থেকে বাঁচতে তার ছায়ার নিচে আশ্রয় খুঁজে নিত।
তখন গ্রামে বিদ্যুৎ ছিল না। সন্ধ্যা নামলে অনেকেই পাটি বিছিয়ে বটগাছের নিচে বসতেন। গল্প হতো, আড্ডা হতো, গ্রামের নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা হতো। কখনও হাসির রোল উঠত, কখনও পুরোনো দিনের স্মৃতিচারণা চলত গভীর রাত পর্যন্ত।
বটগাছটি ছিল গ্রামের এক অঘোষিত মিলনমেলা।
শুধু মানুষ নয়, অসংখ্য পাখিরও ছিল এই গাছকে ঘিরে একটি আলাদা পৃথিবী। ভোর হলেই কিচিরমিচির শব্দে চারদিক মুখর হয়ে উঠত। শালিক, দোয়েল, বুলবুলি, কাক—কত রকম পাখি যে সেখানে বাসা বেঁধেছিল!
ডালের ফাঁকে ঝুলে থাকত বড় বড় মৌচাক। বটের ফল খেয়ে পাখিরা বেঁচে থাকত, ডিম ফুটিয়ে ছানা বড় করত। গাছটিকে দেখলে মনে হতো, মানুষ, পশু, পাখি আর প্রকৃতি—সবাই যেন একই পরিবারের সদস্য।
২০০১ সালের অক্টোবর মাস। লক্ষ্মী পূর্ণিমার রাত।
আমি তখন কলেজে পড়ি। বন্ধুদের সঙ্গে নিমোজখানা হাটে যাত্রাপালা দেখতে গিয়েছিলাম। চারদিকে উৎসবের আমেজ। মানুষের ভিড়, দোকানের আলো আর যাত্রার সুরে মুখর ছিল পুরো এলাকা।
কিন্তু আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না।
যাত্রার বন্দনা শেষ হতেই উত্তর-পশ্চিম আকাশে কালো মেঘ জমতে শুরু করল। বাতাসের গতি দ্রুত বেড়ে গেল। মুহূর্তের মধ্যেই উৎসবের পরিবেশ বদলে গেল আতঙ্কে।
পরিস্থিতি বুঝে যাত্রা কমিটি অনুষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করল। আমরাও দ্রুত বাড়ির পথে রওনা হলাম।
বাড়ি পৌঁছানোর কিছুক্ষণ পরই শুরু হলো ভয়ংকর ঝড়। বাতাসের গর্জনে মনে হচ্ছিল, যেন প্রকৃতি তার সমস্ত শক্তি নিয়ে তাণ্ডব শুরু করেছে। ঘরের দরজা-জানালা কাঁপছিল। চারদিকে শুধু ঝড়ের শব্দ আর অজানা আতঙ্ক।
পরে জানতে পারি, সেটি ছিল একটি ভয়াবহ টর্নেডো।
পরদিন সকালে ক্ষয়ক্ষতির খবর নিতে বেরিয়ে পড়লাম। কিছু দূর যেতেই শুনলাম, আমাদের সেই শতবর্ষী বটগাছটি আর নেই।
খবরটি শুনে বুকের ভেতরটা হঠাৎ শূন্য হয়ে গেল।
দৌড়ে সেখানে গিয়ে দেখি, গ্রামের নীরব প্রহরী মাটিতে লুটিয়ে আছে। বিশাল শিকড়গুলো মাটির বুক চিরে ওপরে উঠে এসেছে। যে গাছটি যুগের পর যুগ ঝড়-বাদল সামলে দাঁড়িয়ে ছিল, সে-ই আজ পরাজিত হয়ে পড়ে আছে।
মনে হচ্ছিল, গ্রামের একটি অংশ হারিয়ে গেছে।
তবে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিয়েছিল পাখিদের অবস্থা। তারা বারবার উড়ে এসে ভাঙা ডালের ওপর বসছিল, আবার উড়ে যাচ্ছিল। যেন বুঝতে পারছিল না, তাদের ঘর কোথায় হারিয়ে গেল।
সেদিন প্রথমবার উপলব্ধি করেছিলাম, একটি গাছের পতন শুধু একটি গাছের মৃত্যু নয়। তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অসংখ্য প্রাণ, অসংখ্য স্মৃতি এবং একটি সম্পূর্ণ জীবনের গল্প।
সময়ের স্রোতে এরপর অনেক বছর কেটে গেছে। প্রায় ত্রিশ বছর ধরে আমি বাড়ির বাইরে থাকি। জীবন আমাকে অনেক দূরে নিয়ে গেছে।
তবু গ্রামের বাড়িতে ফিরলে আমি এখনও সেই জায়গাটিতে দাঁড়াই।
এখন সেখানে আর বটগাছ নেই। নেই তার শীতল ছায়া। নেই ঝুরি ধরে দোল খাওয়া শিশুদের দল। নেই পাখিদের কোলাহল।
আছে শুধু এক টুকরো ফাঁকা জায়গা।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, সেই শূন্যতাই আজ সবচেয়ে বেশি কথা বলে।
চোখ বন্ধ করলেই শুনতে পাই শৈশবের হাসি। কানে ভেসে আসে পাখিদের ডাক। অনুভব করি পাতার মৃদু মর্মরধ্বনি। মনে হয়, বটগাছটি এখনও সেখানে দাঁড়িয়ে আছে—শুধু তাকে আর চোখে দেখা যায় না।
প্রকৃতির নিয়মে সে হারিয়ে গেছে, কিন্তু স্মৃতির জগতে তার কোনো মৃত্যু নেই।
আজও আমার শৈশবের আকাশে সে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।
সে শুধু একটি গাছ ছিল না; সে ছিল একটি গ্রামের ইতিহাস, অসংখ্য প্রাণের আশ্রয়, আর আমার স্মৃতির চিরন্তন শেষ আশ্রয়।


No comments:
Post a Comment