শ্রাবণের বৃষ্টি ধারায় নিজেক যেন নতুন রূপে ফিরে পাওয়া যায়
শ্রাবণ মাস চলছে। চারদিক জুড়ে বর্ষার রাজত্ব। আকাশ যেন দিনের পর দিন ধরে জমিয়ে রাখা সব কান্না একসঙ্গে ঝরিয়ে দিচ্ছে। ভোর থেকে অবিরাম বৃষ্টি পড়ছে। জানালার কাঁচ বেয়ে নেমে আসা জলের রেখাগুলো দেখতে দেখতে হঠাৎ মনে হলো, কতদিন এমন করে বৃষ্টিকে দেখা হয়নি!
একটা সময় ছিল, যখন বর্ষা ছিল আমার সবচেয়ে প্রিয় ঋতু। শৈশবের প্রতিটি বর্ষণমুখর দিন ছিল একেকটি উৎসব। আকাশ কালো হয়ে এলে বুকের ভেতর আনন্দের ঢেউ উঠত। কাগজের নৌকা বানিয়ে বৃষ্টির জলে ভাসিয়ে দেওয়া, ভেজা মাটির গন্ধে হারিয়ে যাওয়া, জানালার ধারে বসে বৃষ্টির গান শোনা—সেই দিনগুলোর সুখ ছিল খুব সাধারণ, অথচ কত গভীর!
তারপর সময় বদলেছে। স্কুল পেরিয়ে কলেজ, কলেজ পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়। জীবনের পথে পথেই বর্ষা আমার সঙ্গী ছিল। কখনও বন্ধুদের আড্ডায়, কখনও একাকী হাঁটায়, কখনও না বলা কোনো অনুভূতির নীরব সাক্ষী হয়ে।
কিন্তু চাকুরি জীবনে প্রবেশ করার পর যেন সবকিছু বদলে গেল।
দায়িত্বের ভার, সময়ের হিসাব, প্রতিদিনের ব্যস্ততা আর জীবিকার অবিরাম দৌড়ের মধ্যে কোথায় যেন হারিয়ে গেল ঋতুগুলোর রঙ। এখন বর্ষা আসে, বর্ষা যায়; কিন্তু তাকে অনুভব করার অবসর আর হয়ে ওঠে না। অফিস যাওয়ার তাড়ায় বৃষ্টি তখন আর কবিতা নয়, হয়ে ওঠে ভেজা রাস্তার দুর্ভোগ। মেঘের ডাক তখন আর স্বপ্ন জাগায় না, বরং বাড়ায় দেরির চিন্তা।
তবুও মনের গভীরে কোথাও একটি মানুষ রয়ে গেছে—যে এখনও বৃষ্টিকে ভালোবাসে।
মাঝে মধ্যে ছুটির দিনগুলোর আগে মনে মনে প্রার্থনা করতাম, যদি কাল সারাদিন বৃষ্টি হয়! যদি একদিনের জন্য সব ব্যস্ততা থেমে যায়! যদি আবার কিছুক্ষণ নিজের সঙ্গে দেখা হয়! যদি আবার ফিরে যাওয়া যায় সেই সোনালি দিন গুলোর কাছে!
কিন্তু জীবনেরও বোধহয় নিজস্ব রসিকতা আছে। বেশিরভাগ সময় ছুটির দিনে আকাশ থাকে নির্মেঘ, আর কর্মদিবসেই নামে মুষলধারে বৃষ্টি।
তাই আজকের দিনটি যেন এক অলৌকিক প্রাপ্তি।
আজ ছুটির দিন। আর সকাল থেকেই ঝুম বৃষ্টি। পৃথিবী যেন ধুয়ে-মুছে একাকার হয়ে গেছে। দূরের গাছগুলো বৃষ্টির পর্দার আড়ালে ঝাপসা। বাতাসে ভেজা মাটির গন্ধ। চারদিকে এক ধরনের প্রশান্ত নীরবতা।
জানালার পাশে বসে থাকতে থাকতে হঠাৎ অনুভব করলাম, আমি আর বর্তমান সময়ে নেই।
আমি ফিরে গেছি বহু বছর পেছনে।
ফিরে গেছি সেই ছোট্ট ছেলেটির কাছে, যে বৃষ্টির দিনে বই খাতা ছুড়ে রেখে ছুটে বেরিয়ে যেত উঠোনে। ফিরে গেছি সেই তরুণটির কাছে, যে মেঘলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখত। ফিরে গেছি সেই দিনগুলোতে, যখন সুখের জন্য খুব বেশি কিছুর প্রয়োজন হতো না।
বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটা যেন স্মৃতির একেকটি দরজা খুলে দিচ্ছিল।
কোথা থেকে ভেসে আসছিল হারিয়ে যাওয়া মানুষের মুখ, ফেলে আসা দিনের হাসি, অপূর্ণ স্বপ্ন আর অগণিত স্মৃতি। মনে হচ্ছিল, সময় আসলে কোথাও যায় না। সবকিছু আমাদের ভেতরেই জমা থাকে। শুধু কখনও কখনও একটি বৃষ্টিভেজা সকাল এসে সেগুলোকে জাগিয়ে তোলে।
অনেকদিন পর আজ নিজের সঙ্গে কথা বললাম।
অনেকদিন পর বুঝলাম, জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান মুহূর্তগুলো আসলে খুব সাধারণ। একটি ছুটির দিন, এক কাপ চা, জানালার পাশে বসে বৃষ্টির শব্দ শোনা, আর স্মৃতির হাত ধরে কিছু দূর হেঁটে যাওয়া—এগুলোই হয়তো প্রকৃত সুখ।
বাইরে তখনও বৃষ্টি ঝরছে।
মনে হলো, প্রকৃতি যেন আমাকে বলছে—"তুমি এখনও হারিয়ে যাওনি। তোমার ভেতরের সেই স্বপ্নবিলাসী মানুষটি এখনও বেঁচে আছে।"
আমি মৃদু হেসে জানালার বাইরে তাকালাম।
আকাশ তখনও কাঁদছে, কিন্তু আমার মন ভরে উঠছে এক অদ্ভুত শান্তিতে।
হয়তো আগামীকাল আবার ব্যস্ত জীবন শুরু হবে। আবার সময়ের পেছনে ছুটতে হবে। কিন্তু আজকের এই শ্রাবণ দুপুর, এই বৃষ্টির শব্দ, এই ফিরে পাওয়া অনুভূতি—এসব আমার হৃদয়ের খুব গভীরে থেকে যাবে। কারণ আজ, বহু বছর পর, শ্রাবণের বৃষ্টিতে আমি শুধু প্রকৃতিকে নয়—নিজেকেও নতুন করে খুঁজে পেয়েছি।

No comments:
Post a Comment