পূজার জৌলুস বেড়েছে, ভক্তি কি কমেছে? - Jamini Kishore Roy

Post Top Ad

পূজার জৌলুস বেড়েছে, ভক্তি কি কমেছে?

Share This

নাড়ুদাকে বললাম, “দাদা, ত্রিশ বছর আগের দুর্গাপূজার সঙ্গে এখনকার পূজার কী পার্থক্য দেখলে?”


নাড়ুদা একটু ভেবে বলল, “নব্বইয়ের দশকের পূজার সঙ্গে এখনকার পূজার তুলনা চলে না রে! তখন পূজার মধ্যে ছিল আধ্যাত্মিকতা, ভক্তি আর এক অদ্ভুত পবিত্র অনুভূতি। আর এখন পূজা যেন অনেকটাই থিম, আলোকসজ্জা, সাউন্ড বক্স আর সোশ্যাল মিডিয়ায় ছবি পোস্ট করার প্রতিযোগিতায় আটকে গেছে।”


একটু থেমে নাড়ুদা আবার বলতে শুরু করল, “আগে পূজার সময় ঢাকের শব্দ শুনলেই মনটা কেমন যেন করে উঠত। ঢাকের তালে তালে মণ্ডপে আরতি হতো, ধূপের গন্ধে চারপাশ ভরে উঠত। অঞ্জলি দেওয়ার সময় সবার মনে থাকত ভক্তি, শ্রদ্ধা আর মায়ের প্রতি এক গভীর টান। পূজার পরিবেশে একটা শুদ্ধতা ছিল, মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কেও ছিল আন্তরিকতা। মণ্ডপে বসে আড্ডা দেওয়া, পরিচিত-অপরিচিত সবার সঙ্গে কুশল বিনিময়—সবকিছুর মধ্যেই ছিল এক ধরনের আত্মিক আনন্দ।”


“আর এখন?”—আমি জিজ্ঞেস করলাম।


নাড়ুদা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “এখন অনেক জায়গায় পূজার চেয়ে পূজার আয়োজনটাই বড় হয়ে উঠেছে। কোন মণ্ডপের থিম কত অভিনব, আলোকসজ্জা কত জমকালো, কার ছবি কত সুন্দর—এসব নিয়েই যেন বেশি মাতামাতি। মণ্ডপে গিয়ে অনেকে প্রথমেই খোঁজে ছবি তোলার জায়গা। তারপর সেই ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করে কে কতটা প্রশংসা পেল, শুরু হয় তার হিসাব। অথচ যে মায়ের আরাধনা করতে মণ্ডপে যাওয়া, সেই মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে কয়েক মুহূর্ত মনটাকে স্থির করার সময়টুকুও যেন আমাদের নেই!”


“তার ওপর মণ্ডপে মণ্ডপে সাউন্ড বক্সের বিকট শব্দ, উদ্ভট গানের প্রতিযোগিতা—সব মিলিয়ে অনেক জায়গায় পূজার স্বাভাবিক পরিবেশটাই হারিয়ে যাচ্ছে। ঢাকের পবিত্র আওয়াজ আর আরতির মন্ত্রধ্বনি যেন হারিয়ে যাচ্ছে শব্দের দাপটে। উৎসবের আনন্দ অবশ্যই থাকবে, নতুন থিম হবে, সুন্দর আলোকসজ্জাও হবে। কিন্তু সেই আনন্দ যদি অন্যের কানে যন্ত্রণা হয়ে ওঠে, যদি ভক্তির পরিবেশটাই নষ্ট হয়ে যায়, তবে সেই আয়োজনের সার্থকতা কোথায়?”


নাড়ুদার কথাগুলো শুনে আমি চুপ করে রইলাম।


সত্যিই তো, সময়ের সঙ্গে পূজার আয়োজন বদলাবে, আধুনিকতার ছোঁয়া লাগবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই পরিবর্তনের ভিড়ে আমরা কি পূজার মূল উদ্দেশ্যটাই ভুলে যাচ্ছি? দুর্গাপূজা শুধু মণ্ডপসজ্জা, আনন্দ-উৎসব কিংবা ছবি তোলার উপলক্ষ নয়; এটি ভক্তি, সাধনা, শুভশক্তির আরাধনা এবং মানুষের সঙ্গে মানুষের আত্মিক বন্ধনের উৎসব।


মা দুর্গার কাছে প্রার্থনা করতে গেলে মনেও তো কিছুটা শুদ্ধতা প্রয়োজন। অন্যের অসুবিধা সৃষ্টি করে, শব্দদূষণ বাড়িয়ে, লোকদেখানো প্রতিযোগিতায় মেতে উঠে আমরা কতটা ভক্তির পরিচয় দিচ্ছি? মায়ের সামনে মাথা নত করলেই কি ভক্তি সম্পূর্ণ হয়, নাকি আমাদের আচরণেও সেই ভক্তির প্রতিফলন থাকা প্রয়োজন?


পূজার জৌলুসে নয়, ভক্তির গভীরতায় মায়ের আরাধনার সার্থকতা। মণ্ডপ যত বড়ই হোক, আলোকসজ্জা যতই চোখধাঁধানো হোক, হৃদয়ে যদি শ্রদ্ধা, আচরণে যদি সংযম আর মানুষের প্রতি যদি সহমর্মিতা না থাকে, তবে সেই পূজার পূর্ণতা কোথায়?


নাড়ুদার শেষ কথাটা আজও কানে বাজে— “মাকে খুঁজিস মণ্ডপের আলোয় নয়, নিজের মনের ভক্তিতে। কারণ পূজার আসল সৌন্দর্য চোখে দেখার মধ্যে নয়, হৃদয় দিয়ে অনুভব করার মধ্যে।”


No comments:

Post a Comment

Post Bottom Ad

Pages