অফিসে যে সাতটি কথা না বলাই ভালো—নাড়ুদার পরামর্শ - Jamini Kishore Roy

Post Top Ad

অফিসে যে সাতটি কথা না বলাই ভালো—নাড়ুদার পরামর্শ

Share This

নাড়ুদার সঙ্গে গল্প করছি। কথায় কথায় অফিসের নানা বিষয়, কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ, সহকর্মীদের সঙ্গে সম্পর্ক—এসব নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। নাড়ুদা দীর্ঘদিন ধরে চাকরি করছে। কর্মজীবনে অনেক অভিজ্ঞতার ঝুলি তার। তাই একসময় বলেই ফেললাম,

naruda


— দাদা, অনেক দিন তো চাকরি করছেন। অফিসের পরিবেশ, সহকর্মীদের সঙ্গে আচরণ কিংবা কর্মক্ষেত্রে চলাফেরা নিয়ে কিছু পরামর্শ দিন না!


নাড়ুদা একটু মুচকি হেসে বলল,


— শোন, দীর্ঘদিন চাকরি করে একটা বিষয় বুঝেছি, অফিসে সব কথা বলতে নেই। বিশেষ করে কিছু কথা আছে, যেগুলো মুখ ফসকে একবার বেরিয়ে গেলে সম্পর্ক, সম্মান ও কর্মপরিবেশ—সবকিছুর ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। আমার অভিজ্ঞতায়, অফিসে সাত ধরনের কথা এড়িয়ে চলতে পারলে অনেক অপ্রয়োজনীয় ঝামেলা থেকে নিজেকে দূরে রাখা যায়।


আমি আগ্রহ নিয়ে শুনতে লাগলাম।


১. ‘এটা আমার কাজ নয়’


অফিসে কেউ কোনো কাজের দায়িত্ব দিতে চাইলে অনেকেই প্রথমেই বলে বসেন, ‘এটা তো আমার কাজ নয়।’ কথাটি হয়তো বাস্তবতার নিরিখে ঠিক, কিন্তু বলার ধরনটি অনেক সময় নেতিবাচক বার্তা দেয়। সহকর্মী মনে করতে পারেন, আপনি সহযোগিতা করতে আগ্রহী নন।


তাই সরাসরি প্রত্যাখ্যান না করে বলা যেতে পারে, ‘বিষয়টি আমার নির্ধারিত দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না। তবে কীভাবে সহযোগিতা করা যায়, সেটা দেখছি।’


এতে নিজের দায়িত্বের সীমা যেমন পরিষ্কার থাকে, তেমনি সহযোগিতার মনোভাবও প্রকাশ পায়।


২. ‘আমি তো আগেই বলেছিলাম!’


কোনো কাজ ব্যর্থ হলে কিংবা প্রত্যাশিত ফল না এলে অনেকেই বলে ওঠেন, ‘আমি তো আগেই বলেছিলাম, এমনটাই হবে।’


এ কথার মধ্যে একধরনের আত্মতৃপ্তি প্রকাশ পায়, যেন অন্যের ব্যর্থতায় আপনি নিজের বুদ্ধিমত্তার প্রমাণ খুঁজে পেয়েছেন। এতে সমস্যার সমাধান তো হয়ই না, বরং সম্পর্কের অবনতি ঘটে।


এর পরিবর্তে বলা যায়, ‘বিষয়টি নিয়ে আগে আমাদের কিছু আলোচনা হয়েছিল। যাই হোক, এখন কীভাবে সমস্যাটি সমাধান করা যায়, সেটাই দেখি।’


মনে রাখতে হবে, অফিসে কে আগে ঠিক বলেছিল, তার চেয়ে সমস্যার সমাধান করাটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।


৩. ‘অমুক তো কোনো কাজই করে না!’


সহকর্মীর কাজ নিয়ে পেছনে সমালোচনা করা অফিসের পরিবেশ নষ্ট করার অন্যতম কারণ। সাময়িকভাবে হয়তো এমন কথা বলে নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করা যায়, কিন্তু এতে ধীরে ধীরে পারস্পরিক বিশ্বাস ও সম্মান নষ্ট হয়।


কারও কাজে ঘাটতি থাকলে আড়ালে সমালোচনা না করে সরাসরি, ভদ্রভাবে বিষয়টি বুঝিয়ে বলা ভালো। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তথ্য-প্রমাণসহ জানানো যেতে পারে।


অন্যের দুর্বলতা নিয়ে আলোচনা করার চেয়ে নিজের কাজের মান উন্নত করাই বেশি জরুরি।


৪. ‘এভাবে তো সব সময় হয়ে আসছে!’


অফিসে নতুন কোনো নিয়ম, পদ্ধতি কিংবা প্রযুক্তি চালু হলে অনেকেই পুরোনো অভ্যাস আঁকড়ে ধরে বলেন, ‘এভাবে তো সব সময় হয়ে আসছে!’


এ ধরনের মন্তব্য পরিবর্তনের প্রতি অনীহা প্রকাশ করে। কর্তৃপক্ষের কাছে মনে হতে পারে, আপনি নতুন ব্যবস্থার সঙ্গে মানিয়ে নিতে আগ্রহী নন।


অথচ সময়ের সঙ্গে কাজের ধরন ও পদ্ধতি বদলাবে, এটাই স্বাভাবিক। তাই বলা যেতে পারে, ‘পদ্ধতিটি নতুন, তবে বুঝে নিলে নিশ্চয়ই মানিয়ে নিতে পারব।’


পরিবর্তনকে ভয় না পেয়ে শেখার মানসিকতা রাখা উচিত।


৫. ‘আমি পারব না!’


অফিসে কোনো দায়িত্ব বা কাজ দেওয়া হলে সরাসরি ‘আমি পারব না’ বলা অনেক সময় নিজের সক্ষমতা সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করে।


তবে তার মানে এই নয় যে, অসম্ভব কোনো কাজও বিনা প্রশ্নে গ্রহণ করতে হবে। বরং কাজটির জটিলতা ও বাস্তবতা বুঝিয়ে বলা প্রয়োজন।


যদি কাজটি কঠিন হয়, বলা যায়, ‘কাজটি কিছুটা চ্যালেঞ্জিং, তবে চেষ্টা করে দেখি।’


আর যদি সত্যিই কাজটি করা সম্ভব না হয়, তাহলে ভদ্রভাবে বলা যেতে পারে, ‘দুঃখিত স্যার, বর্তমান পরিস্থিতিতে কাজটি করা আমার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। অনুমতি দিলে কারণটি একটু ব্যাখ্যা করতে চাই।’


৬. ‘আমার কোনো দোষ নেই!’


কোনো কাজে ভুল হলে অনেকেই প্রথমে নিজের দায় এড়ানোর চেষ্টা করেন। নানা অজুহাত দেখান, অন্যের ওপর দোষ চাপান কিংবা নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আরও জটিলতা তৈরি করেন।


এতে ভুলের চেয়ে ভুল আড়াল করার প্রবণতাটাই বড় হয়ে দেখা দেয়।


নিজের ভুল হলে সরাসরি স্বীকার করা উচিত। বলা যায়, ‘ভুলটি আমার হয়েছে। আমি দুঃখিত। ভবিষ্যতে যেন এমন না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকব।’


আর ভুলটি নিজের না হলে আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য উত্তেজিত না হয়ে শান্তভাবে প্রকৃত বিষয়টি ব্যাখ্যা করা উচিত।


মনে রাখতে হবে, ভুল স্বীকার করা দুর্বলতা নয়; বরং এটি দায়িত্বশীলতার পরিচয়।


৭. ‘আপনাকে দিয়ে কোনো কাজ হবে না!’


বিশেষ করে জুনিয়র সহকর্মীদের উদ্দেশে এ ধরনের কথা বলা একেবারেই উচিত নয়। একজন নতুন কর্মী হয়তো কোনো কাজ ঠিকভাবে করতে পারছেন না। কিন্তু তাই বলে তাঁকে অযোগ্য বলে দাগিয়ে দেওয়া ঠিক নয়।


এতে তাঁর আত্মবিশ্বাস নষ্ট হয়, কাজের প্রতি আগ্রহ কমে যায়।


বরং বলা উচিত, ‘এখনো ঠিকভাবে পারছ না, তবে চেষ্টা করলে অবশ্যই পারবে। প্রথম দিকে আমিও অনেক কিছু পারতাম না। ধীরে ধীরে শিখেছি। তোমাকেও শিখতে হবে।’


একজন সিনিয়র সহকর্মীর কাজ শুধু নিজের দায়িত্ব পালন করা নয়, জুনিয়রদের শেখানো ও এগিয়ে যেতে সাহায্য করাও।


সাতটি কথা বলা শেষ করে নাড়ুদা আমার দিকে তাকিয়ে বলল,


— বুঝলি, অফিসে ভালো কর্মী হওয়ার জন্য শুধু কাজ জানলেই হয় না, কথাও জানতে হয়। কখন কী বলতে হবে, কীভাবে বলতে হবে, আর কখন চুপ থাকতে হবে—এগুলোও কর্মজীবনের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।


আমি বললাম,


— দাদা, তাহলে কি অফিসে সব সময় মেপে মেপে কথা বলতে হবে?


নাড়ুদা হেসে বলল,


— তা নয় রে! কথা বলবি মন খুলে, তবে মুখ খুলে এমন কিছু বলবি না, যা পরে নিজের জন্যই বিপদ ডেকে আনে। মনে রাখবি, অফিসে কথারও একটা হিসাব আছে। হিসাবের খাতায় ভুল হলে যেমন সংশোধন করা যায়, মুখের কথা একবার বেরিয়ে গেলে সব সময় তা সংশোধন করা যায় না!


নাড়ুদার কথা শুনে মনে হলো, কর্মজীবনে শুধু পদ-পদবি কিংবা অভিজ্ঞতাই মানুষকে দক্ষ করে তোলে না; মানুষের সঙ্গে কথা বলার কৌশল, সংযম ও পারস্পরিক সম্মানবোধও একজন মানুষকে প্রকৃত পেশাদার হিসেবে গড়ে তোলে।


অফিসে আপনার যোগ্যতা আপনাকে পরিচিতি দিতে পারে, কিন্তু আপনার আচরণ ও কথাবার্তাই আপনাকে মানুষের কাছে সম্মানিত করে তোলে।


No comments:

Post a Comment

Post Bottom Ad

Pages