হেমন্তের সকালে গম ক্ষেতের পাখি তাড়ানোর গল্প
মাঝে মাঝে জীবনের ব্যস্ত রুটিনে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ ই কোথা থেকে যেন মনের মধ্যে ভেসে ওঠে সোনালি ধুলোর মতো কিছু স্মৃতি। তখন মনে পড়ে যায় আমাদের গ্রামের সেই গমক্ষেত—যেখানে ভোরের আলো পড়লেই চারদিক যেন সোনার পর্দা মুড়ে ফেলত। বাতাসের হালকা ছোঁয়ায় দুলে ওঠা গমের শীষগুলো ছিল রূপকথার মতন।
মাঝে মাঝে হঠাৎ করে স্মৃতির বাঁক পেরিয়ে চলে যাই সেই হারিয়ে যাওয়া শৈশবের দিনগুলোতে। আমাদের গ্রামে একসময় প্রচুর গমের আবাদ হতো! চারদিকে সোনালি আভা ছড়ানো গমক্ষেত ছিল যেন আমাদের জীবনেরই এক টুকরো রূপকথা। এখন তো সেসব দেখা যায় না বললেই চলে—গম চাষ কমে গেছে, আর কমে গেছে সেইসব দিনের সেই সহজ সরল আনন্দ।
মাটিতে চাষ দেওয়ার পর গম বীজ বপনের কয়েক দিনের মধ্যেই শুরু হতো আমাদের আসল ব্যস্ততা—কাক পক্ষী তাড়ানো! ভেজা মাটির নরম বীজ যেন কাক-পক্ষীদের দারুণ খাবার; ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই ঝাঁকে ঝাঁকে তারা নেমে আসত ক্ষেতে। তখনকার দিনে পাখির সংখ্যা ছিল অনেক বেশি, তাই সকাল থেকে দুপুর_বেলা পর্যন্ত পাহারা না দিলেই নয়।
এই পাহারা দেওয়ার দায়িত্ব পড়ত বাড়ির বয়স্কদের পাশাপাশি আমাদের ছোটদের ওপরও। আমিও সেই দলে ছিলাম। আশেপাশের ছেলেরা সবাই মিলে খুব ভোরে বেরিয়ে যেতাম ক্ষেতে। ক্ষেতের মধ্যে কাক তাড়ুয়া দেওয়া হতো কিন্তু কাক তাড়ুয়াকে কাক পক্ষীরা পাত্তাই দিতো না । তাই আমাদের কারো হাতে বাঁশের কাঠি, কারো হাতে ঢিল, আবার কারো হাতে থাকতো বাঁশের তৈরি তীর-ধনুক। আশ্চর্যের বিষয়, ঢিল মারলে কাক খুব একটা ভয় পেত না, কিন্তু তীর-ধনুক দেখলেই যেন দিশেহারা হয়ে পালিয়ে যেত। কেন যে এমন হতো, আজও রহস্যই রয়ে গেছে!
চাদরের খোঁচায় ভরে নিতাম একটু মুড়ি, কখনো বাতাসা না-হয় একটা গুড়ের টুকরো। কুয়াশা আর ঠান্ডা বেশি পড়লে খড়ের মধ্যে আগুন দিয়ে কখনও কখনও আগুন পোহাতাম । হুট হুট,হিস হিস করে আমরা পাখি তাড়াতাম। ছোট বড়দের নানা রকম শব্দ যেন অন্য রকম একটা পরিবেশের তৈরি করতো । সারা সকাল ধরে কাক তাড়ানো, বন্ধুদের সঙ্গে হইচই করা—এই সবকিছু মিলিয়ে সে যেন ছিল আমাদের ছোট্ট উৎসব। স্কুল থাকলেও আমরা তেমন পড়াশোনার চাপ অনুভব করতাম না; জীবনের চিন্তা, ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তা—কিছুই ছিল না আমাদের মাথায়। আর বিকেলের দিকে আবারও গিয়ে দাঁড়াতাম গমক্ষেতে। একই রকম রোদ, একই রকম হাসি, আর একই রকম কাক-পক্ষীর আনাগোনা।
এখন আর সেসব দিন নেই। গমের আবাদ কমেছে, পাখির সংখ্যা কমেছে, আর আমরা বড় হয়ে গেছি। কিন্তু হৃদয়ের গভীরে জমে থাকা সেই স্মৃতিগুলো এখনও টলমল করে ওঠে। মাঝে মাঝে মনে পড়লে এক অদ্ভুত আনমনা ভাব এসে ভর করে—মনে হয় যেন আবার একবার ফিরে যাই সেই গমক্ষেতে, সেই তীর-ধনুক হাতে, সেই সহজ সরল শৈশবের ভোরগুলোর মধ্যে।
No comments:
Post a Comment