ফেরা না–ফেরার রেলগাথা - Jamini Kishore Roy

Post Top Ad

ফেরা না–ফেরার রেলগাথা

Share This
ফেরা না–ফেরার রেলগাথা
আজ চিলাহাটি এক্সপ্রেসে চেপে রওনা দিলাম শ্রীপুরের উদ্দেশ্যে—আমি, আমার স্ত্রী আর আমাদের ছোট ছেলে সৌমিক। জীবনের টানে, পেশার প্রয়োজনেই দীর্ঘদিন ধরে বাড়ির বাইরে থাকতে হয়। ১৯৯৬ সাল থেকে শুরু—তারপর কত বছর যে পথের ধুলো জমেছে পায়ের তলায়! ক্লাস সিক্স থেকে বাড়ি ছাড়া জীবন, আর চাকরিতে ঢোকার পর সেই দূরত্ব আরও দীর্ঘ হয়েছে।

বাড়ি থেকে একবার বের হলে যেন সহজে আর ফেরা হয় না। মন চায় থাকতে নিজের গ্রামে—পুকুরপাড়ে, উঠোনে, আত্মীয়-স্বজনের হাসি-খুশির মাঝখানে। মন চায় ঘরেই কাজ করতে—চাই সেটা চাকরি হোক, ব্যবসা হোক বা কৃষিকাজ। কিন্তু জীবনের বাস্তবতা অনেক সময় ইচ্ছাকে ছাড়িয়ে যায়।

যারা বাড়ির বাইরে থাকে, তারা জানে কী কী হারায়—কত অনুষ্ঠানে থাকা হয় না, কত উৎসব ফসকে যায়, কত আনন্দ হাতছাড়া হয়। দিনের শেষে কাছের মানুষের মুখ দেখা—এ এক বিশেষ শান্তি। কিন্তু যারা দূরে, কয়েকশ কিলোমিটার দূরে থাকে, তারা সেই সহজ আনন্দ থেকেও বঞ্চিত হয়।

আজ প্রথমবার আমাদের ছেলে সৌমিককে নিয়ে বাড়ির বাইরে বের হলাম। মনে হচ্ছে, তারও নতুন এক অধ্যায় শুরু হয়ে গেল আজ থেকে—হয়তো তারও শুরু হল প্রবাসী জীবনের গল্প। বাবার জীবন যেখানে কেটেছে দূরে দূরে, ছেলের জীবন কি তবে আরও দূর দেশ পর্যন্ত গড়াবে? কে জানে, আজ যে শিশুটি গ্রাম ছেড়ে কয়েকশ কিলোমিটার দূরে যাচ্ছে, একদিন হয়তো দেশের সীমানাও পেরিয়ে যাবে।

আট নয় মাস ধ‌রে সৌ‌মিক ও তার মা বা‌ড়ি‌তে ছিল, আজ বা‌ড়িটা একটু ফাঁকা হ‌য়ে গেল । যে ছে‌লের জন্ম হ‌য়ে‌ছে বা‌ড়ির বাই‌রে,‌সে কি আর বা‌ড়ি‌তে ফির‌বে সহসা ।  
স্টেশনে বিদায়ের মুহূর্তগুলো ভারী ছিল—তার মামা, দাদা ডোমার স্টেশনে পৌঁছে দিয়ে গেল। চোখেমুখে সবারই এক ধরনের কষ্টের ছায়া। ট্রেন ছেড়ে দিল, আমরা ছুটে চললাম গন্তব্যের দিকে। এই পথ কোথায় শেষ হবে, সীমান্ত কোথায়—তা আজও জানি না।

তবু জীবন থেমে থাকে না। চলতে হয়, এগোতে হয়। আর এই চলার মাঝেই লেখা হয় প্রতিটি মানুষের নিজস্ব গাথা—ফেরা না-ফেরার রেলগাথা।

No comments:

Post a Comment

Post Bottom Ad

Pages