জমির আইল কাটা মাস্টারঃ
আমাদের গ্রামে এক বিচিত্র জাতের মানুষ পাওয়া যায়—গরুর গাড়ির চালক আছে, খেজুর গাছের রস খাইয়ে দেওয়া লোক আছে, কলাই ভাজার ওস্তাদ আছে—কিন্তু এদের সবার মধ্যে সবচেয়ে রহস্যময় হলো এক বিরল প্রজাতি: জমির আইল কাটা মাস্টার।
এই আইল কাটা মাস্টাররা দেখতে সাধারণ মানুষের মতো; বাজারে দেখলে আপনি বুঝতেও পারবেন না যে এরা এতো বড় বিশেষজ্ঞ। কিন্তু মাঠে পা দিলেই এদের চোখ চকচক করে ওঠে, যেন সোনার খনি দেখেছে। আর কি আশ্চর্য—এদের হাতে কোদাল দেখলেই আইলগুলো কেমন যেন কাঁপতে শুরু করে!
গ্রামের অন্য সবাই যখন ধান রোপণ, আগাছা দমন, পানি ধরে রাখা—এসব চিন্তায় ব্যস্ত, তখন এদের মাথায় চলে ভিন্ন সুর। এদের মনে হয়—“হুম, এই আইলটা তো বেশ মোটা হয়েছে, একটু সরিয়ে দিলে মন্দ হয় না।”
যেন আইলটা কোনো পথভ্রষ্ট ছাগল, যাকে ধাওয়া করে একটু ডান-বাম করা দরকার!
মজার ব্যাপার হলো—আইল কাটাটাই এদের নেশা। লাভ-ক্ষতির হিসাব এদের কাছে গুরুত্বহীন। কেউ জমির আয়তন বাড়ানোর জন্য আইল কাটে, কিন্তু আমাদের মাস্টাররা কাটেন শখে!
পাতকুয়া কাটতে গেলে যেমন লাইন-লাইন করে মাটি ওঠে, এদের কোদালের কোপও তেমন তাল-মিল রেখে নামতে থাকে আইলের মাথায়। ফলাফল—গত বছর যা ছিল তিন হাত মোটা আইল, এ বছর হয়ে যায় দুই আঙুলের সরু সরু সরু “টান টান” এক রেখা!
এদের সবচেয়ে বড় কীর্তি হলো—আইলকে বেঁকা বানানো।
শুরু হলো উত্তর দিক থেকে—শেষে গিয়ে দেখা গেল আইলটা ধনুকের মতো বাঁক নিয়ে পাশের জমির দিকে গিয়ে চুমু খেয়ে ফেলেছে। এমন দেখে মনে হয়, আইলটাও বুঝি পাশের জমির মালিকের প্রতি গোপন প্রেম পোষণ করে!
পাশের জমির মালিক এসব দেখে মাথায় হাত দেন। প্রথমে ভদ্রভাবে বলেন,
“ওই ভাই, আমার আইলে কোদাল দিও না।”
মাস্টার তখন ঠোঁট উল্টে বলেন,
“আরেহ, কোদাল তো নড়াইসি মাত্র! কিইবা হইছে?”
কিন্তু বছর শেষে দেখা যায়—‘নড়াইসি মাত্র’-টা আইলকে সরিয়ে এনেছে পুরো এক হাত!
সবচেয়ে মজার ঘটনা হলো—এই আইল কাটার পর নাকি এদের তেমন কোনো লাভই হয় না। জমির আয়তন বাড়ে তো সামান্যই, অথচ ঝামেলা বাড়ে অনেক। তবু কেন যেন এদের মন মানে না। হয়তো এটা অভ্যাস, কিংবা বংশগত প্রতিভা—কে জানে!
গ্রামে কেউ কেউ বলে—
"ওরা জমি বাড়ায় না, ঝগড়া বাড়ায়!"
কেউ আবার হেসে বলে—
"জমির মাপ কম-বেশি হয়, কিন্তু আইল কাটার ইজ্জত কমে না।"
আমাদের এলাকায় এই বিশেষ প্রজাতির সংখ্যা কম নয়। তাই আমি তাদের সম্মানের সাথে একটা উপাধি দিয়েছি—
জমির আইল কাটা মাস্টার
যারা কোদালের এক খোঁচায় আইলের সোজা জীবনকে বেঁকা করে দেওয়ার অতিমানবিক ক্ষমতা রাখেন।
তবে কথা হলো—কোনো মাস্টারকে তো আর অবহেলা করা যায় না!
তারা যদি একদিন ইচ্ছে করে আইল না কাটেন, তখনই বুঝবেন—গ্রামের শান্তিতে আসলেই শান্তি আছে।