অগ্রহায়ণের ব্যস্ত মাঠ ও হারিয়ে যাওয়া সোনালী দিনের স্মৃতি
অগ্রহায়ণ মাস মানেই বাংলার গ্রাম্য জীবনে পরম ব্যস্ততার ঋতু। সোনালি ধান পাকার মৌসুমে মাঠ যেন উৎসবের মতো মুখর হয়ে ওঠে। ক’দিন আগে গ্রামের বাড়িতে গিয়ে দেখলাম—ধান কাটার শেষ গতি চলছে, এখনও কিছু জমিতে কচি সোনালি ধান মাথা তুলে দুলছে। এদিকে গনহারে মাড়াইয়ের কাজ চলছে। যেদিকে তাকাই, মানুষের হাতে কাজের ছটা—আলু বপন, সরিষা ও ভুট্টা বোনা, রবি শস্যের নানা প্রস্তুতি। যেন সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটে চলেছে পুরো গ্রাম।
কিন্তু এই ব্যস্ততার ছবি সবসময় এমন ছিল না। ছোটবেলায় আমাদের গ্রাম এতটা কর্মচঞ্চল ছিল বলে মনে পড়ে না। তখন আবাদ বলতে ছিল আমন ধান, খেসারী, মুগ ডাল, আলু, রসুন, পেয়াজ, মরিচ, গম, তামাক, কাউন কিংবা আউশ। ইরি ধানের আগমনের আগে কৃষিকাজ ছিল অনেকটাই প্রকৃতিনির্ভর ও সময়সাপেক্ষ। আমন ধান কাটার পরও দীর্ঘদিন ধরে ধান মাঠেই পড়ে থাকত। মাঠের মধ্যে চালা বেঁধে ডেরা পেতে কৃষকেরা পাহারা দিত—সেটা ছিল কৃষকের এক আলাদা জীবনরীতি। ধান বাড়িতে আনলেও সঙ্গে সঙ্গে মাড়াই হতো না; অনেক দিন ধরে পুঞ্জ করে রাখা হতো। কাজের গতি ছিল ধীর, কিন্তু সেই ধীরতার মাঝেও ছিল এক ধরনের শান্তি, ছিল একতা।
গ্রামের সেই সময়গুলোতে আনন্দও ছিল আলাদা। পাড়া-প্রতিবেশে গান-বাজনার ধুম, আত্মীয়ের বাড়িতে যাওয়া-আসা, বিকালের সোনালি রোদে আড্ডার আসর—সব মিলিয়ে ছিল এক অমলিন সাধারণ সুখ। জীবন যেন একটু ধীর লয়ে বয়ে যেত, তবুও তা ছিল পরিপূর্ণ।
কিন্তু সময় বদলেছে। প্রযুক্তি, উন্নত বীজ ও আধুনিক কৃষিপদ্ধতির ফলে কাজের ধরন ও গতি বদলে গেছে। আজ সবাই ব্যস্ত, যেন জীবনকে দ্রুত ছুটতে হয়—না হলে পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা। বাড়িতে এসেও আগের মতো সময় কাটাতে পারি না; সবাই কাজের চাপে ক্লান্ত, অবসর যেন এক দুর্লভ সম্পদ।
মাঝে মাঝে মনে প্রশ্ন জাগে—এই ব্যস্ততার দৌড়ঝাঁপে মানুষ আসলে কী পায়? জীবনের স্বাদটা কি তারা ঠিকমতো উপভোগ করতে পারে? যারা কাজের পেছনে জীবন কাটিয়ে দেয়, তারা কি কখনও থেমে দেখে—এই পৃথিবীর নির্মল রোদ, বাতাস, বা মানুষের সঙ্গে কাটানো কয়েকটি হাসিখুশি মুহূর্ত কত মূল্যবান?
কিন্তু এ-ও সত্য, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সবকিছুই বদলায়। পরিবর্তনকে এড়ানো যায় না। তাই সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে, তবে জীবনের স্বাদ ভুলে নয়। কাজের মধ্যেও আনন্দ খুঁজে নিতে হবে, ব্যস্ততার ভিড়েও একটু বিশ্রাম, একটু নিজেকে ফিরে পাওয়ার মুহূর্ত তৈরি করতে হবে।
জীবনকে নিজের মতো করে সাজিয়ে নেওয়া, ছোট ছোট সুখের মুহূর্তগুলোকে উপভোগ করা—এই তো জীবনের আসল রস।
নতুন যুগের ব্যস্ততা আর হারানো দিনের স্মৃতি—এই দুয়ের মাঝেই আমাদের পথ চলা।
ব্যস্ততার ভিড়ে একটু থামা, নিজেকে ফিরে দেখা, প্রিয় মানুষদের সঙ্গে কিছু উষ্ণ সময় কাটানো—এসবই তো জীবনের প্রকৃত সম্পদ।
কাজ থাকবে, উন্নতি আসবে, সময় ছুটবে তার মতো। কিন্তু আমরা যদি জীবনের প্রতিটি ক্ষণকে নিজের মতো করে সাজাতে পারি, ছোট ছোট আনন্দগুলোকে উপভোগ করতে পারি—তবেই জীবন হয়ে উঠবে সত্যিকার অর্থে পরিপূর্ণ অগ্রহায়ণের মাঠের মতোই—সোনালি, উজ্জ্বল, আর প্রাচুর্যে ভরা।