স্বপ্নভঙ্গের বাংলায় দাঁড়িয়ে কিছু কথা - Jamini Kishore Roy

স্বপ্নভঙ্গের বাংলায় দাঁড়িয়ে কিছু কথা

Share This
একটা সময় ছিল—যখন সমাজ মানেই ছিল মানুষ, সম্পর্ক আর সংস্কৃতির সম্মিলিত সুর। পাড়ায় পাড়ায় যাত্রাপালা, নাটক, পালাগান, পুতুলনাচ—এসব শুধু বিনোদন ছিল না, ছিল মানুষের হৃদয়ের ভাষা। বারো মাসে তেরো পার্বণ লেগেই থাকত, উৎসবের মধ্যে দিয়েই মানুষ মানুষকে চিনত, আপন করে নিত। অর্থের অভাব ছিল, কিন্তু অভাব ছিল না আন্তরিকতার। শিক্ষাগত যোগ্যতা কম থাকলেও মানুষগুলো ছিল মানবিক, বিবেকবান, সহানুভূতিশীল।
ধর্ম তখন বিভাজনের দেয়াল ছিল না, ছিল আত্মশুদ্ধির পথ। যে যার ধর্ম পালন করত, কিন্তু অন্যের ধর্ম নিয়ে বিদ্বেষ বা হানাহানি চোখে পড়ত না। ভিন্ন বিশ্বাসের মানুষ এক পাড়ায়, এক বাজারে, এক উৎসবে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলত। উড়ো কথায় কান দেওয়া ছিল না অভ্যাস; বিচার হতো বিবেক দিয়ে, আবেগ দিয়ে নয়। শান্তি ছিল জীবনের স্বাভাবিক সঙ্গী।

সেই সময় লেখালেখি ছিল আত্মপ্রকাশের মাধ্যম, স্বপ্ন দেখার হাতিয়ার। দেশকে নিয়ে কত স্বপ্ন, কত ভাবনা! জীবনানন্দের কণ্ঠে উচ্চারণ করা যেত—
“তোমরা যেখানে খুশি চলে যাও, আমি রয়ে যাব এই বাংলায়।”
কখনো আবার দ্বিজেন্দ্রলালের মতো দৃপ্ত উচ্চারণ—
“এই দেশে তে জন্ম যেন এই দেশে তে মরি।”

কিন্তু সময় বদলেছে। বদলেছে মানুষের মনন, মূল্যবোধ, দৃষ্টিভঙ্গি। প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে যেন অনুভূতির অবক্ষয় ঘটেছে। বিশেষ করে কবিতা—যা হৃদয়ের সবচেয়ে সংবেদনশীল ভাষা—সেখানে নেমে এসেছে ভাটা। দিনগুলো অদ্ভুত দ্রুততায় পাল্টে গেছে, আর সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে মানুষ যেন তার মানবিক সত্তাকেই হারিয়ে ফেলেছে।

আজ আর আগের মতো আন্তরিক মানুষ চোখে পড়ে না। শান্তির জায়গা দখল করেছে হিংসা ও বিদ্বেষ। ন্যায়–অন্যায় বিচার করার মতো বিবেক যেন ক্রমেই লোপ পাচ্ছে। আজকাল অন্যের মৃত্যুতে কষ্ট পাওয়ার চেয়ে উল্লাস প্রকাশ করাই যেন স্বাভাবিক আচরণ হয়ে উঠেছে। মানুষ ক্রমে এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে সে হিংস্র জানোয়ারের চেয়েও বেশি হিংস্র।

অথচ সনদ, সার্টিফিকেট, ডিগ্রির সংখ্যা বেড়েই চলেছে। কিন্তু তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কমছে হিতাহিত জ্ঞান, নৈতিকতা ও মানবিকতা। মতের সঙ্গে মত না মিললেই শুরু হয় ট্যাগিং, আক্রমণ, চরিত্রহনন। বিশেষ করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষদের জন্য পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। ধর্ম অবমাননার অভিযোগে যখন-তখন আক্রমণ যেন নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে। যুক্তি নয়, হিংসাই হয়ে উঠেছে শেষ কথা।

এই দেশকে নিয়ে এক সময় কত স্বপ্ন দেখতাম—আজ সেসব স্বপ্ন ভাবনার স্তরেই আর আসে না। মনে হয়, দেশ নিয়ে ভাবার দায় যেন কারও নেই। দিন দিন দেশ যেন এগিয়ে যাচ্ছে এক অন্ধকার খাদের দিকে। কিছু উস্কানিদাতা বিদেশে বসে নিয়মিত ঘৃণার আগুন জ্বালিয়ে যাচ্ছে, আর তাদের অনুসারীরা অন্ধের মতো সেই ফাঁদে পা দিয়ে দেশটাকে বিশ্ব দরবারে হাসির পাত্রে পরিণত করছে।

দেশে আজ স্বাভাবিক মৃত্যুরও নিশ্চয়তা নেই। যারা ক্ষমতায় আসে, তারাই যেন একেকজন রাক্ষসরাজ রাবণ হয়ে ওঠে। ক্ষমতার বদলে নৈতিকতা, দায়িত্বের বদলে দম্ভ—এই চিত্রটাই বারবার ফিরে আসে। এরই মধ্যে কবিতাও আর আসে না, স্বপ্ন দেখতেও ইচ্ছে করে না। এখানে স্বপ্ন দেখাটাই এখন এক কঠিন, প্রায় অসম্ভব কাজ।

রবীন্দ্রনাথের কথাই বারবার মনে পড়ে—
“রেখেছ বাঙালি করে, মানুষ করোনি।”
তবে কি সত্যিই আমরা মানুষ হতে পারিনি? নাকি কেবল মানুষের মতো অভিনয় করেই চলেছি?

এই প্রশ্নটাই আজ সবচেয়ে জরুরি। কারণ মানুষ না হলে দেশ বাঁচে না, সমাজ বাঁচে না, ভবিষ্যৎ বাঁচে না। প্রযুক্তি, উন্নয়ন, ক্ষমতা—সবই অর্থহীন হয়ে যায় যদি মানবিকতা না থাকে। হয়তো এখনও দেরি হয়ে যায়নি। হয়তো এখনও কেউ কেউ আছে, যারা বিবেক দিয়ে বিচার করে, ঘৃণার বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, মানুষের পাশে মানুষ হয়ে দাঁড়ায়। তাদের হাত ধরেই আবার একদিন নতুন স্বপ্ন দেখা যাবে—এই আশাটুকুই এখন বেঁচে থাকার শেষ অবলম্বন।

No comments:

Post a Comment

Pages