নাড়ুদার চিনি-কাণ্ড
অনেক দিন পর নাড়ুদা আমাদের বাড়িতে বেড়াতে এসেছেন। নাড়ুদাকে কাছে পেলে মন খারাপ করে থাকার কোনো উপায় নেই। মানুষটা যেখানে থাকেন, সেখানেই যেন অকারণে হাসির একটা বাতাস বইতে শুরু করে। গল্প করতে করতে কখন যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যায়, তার হিসাব থাকে না।
সেদিনও আমরা বেশ জমিয়ে গল্প করছি। নাড়ুদার গল্পের ভাণ্ডারে যেন কোনোদিন দুর্ভিক্ষ হয় না। একটা গল্প শেষ হতে না হতেই আরেকটা গল্প হাজির।
ঠিক তখনই বাড়িতে হাজির হলো প্রায় দশ-পনেরোজন আত্মীয়।
দাদার মামা-শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়। নতুন আত্মীয়। জীবনে এই প্রথম আমাদের বাড়িতে এসেছেন।
নতুন আত্মীয় বলে কথা! বাড়িতে যেন হঠাৎ ভি আই পি সম্মেলন বসে গেল।
বৌদি তো আপ্যায়নের কাজে একেবারে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। কে কী খাবেন, কে কী নেবেন—সবকিছুর হিসাব চলছে। মা-ও বৌদিকে সাহায্য করতে নেমে পড়লেন।
কিছুক্ষণের মধ্যেই নাস্তার পর্ব বেশ সাফল্যের সঙ্গে শেষ হলো।
এরপর এলো আসল বিপদ—চা।
চা পাতা আছে।
দুধ আছে।
জল আছে।
কাপও আছে।
শুধু নেই—চিনি!
আজকের দিনে হলে হয়তো পাঁচ মিনিটের মধ্যে কেউ বাজার থেকে চিনি এনে ফেলত। কিন্তু তখনকার দিন। আমাদের বাড়ি থেকে বাজার প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে। এতগুলো নতুন আত্মীয়কে বসিয়ে রেখে চিনি আনতে লোক পাঠানোও সহজ ব্যাপার নয়।
মা চিন্তিত।
বৌদি চিন্তিত।
আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি।
শেষ পর্যন্ত মা বললেন,
—পাশের বাড়ি থেকে একটু চিনি নিয়ে আয়।
ঠিক তখনই নাড়ুদা গম্ভীর মুখে বললেন,
—চিনি লাগবে না।
মা অবাক।
—চিনি লাগবে না মানে?
—চিনি ছাড়াই চা বানান।
মায়ের মুখ দেখে মনে হলো, নাড়ুদা এইমাত্র পরিবারের সম্মান বিক্রি করে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন।
—চিনি ছাড়া চা! নতুন আত্মীয় বাড়িতে এসেছে, আর তুমি বলছ চিনি ছাড়া চা দেব?
নাড়ুদা একটুও বিচলিত হলেন না।
—সবকিছু আমার ওপর ছেড়ে দেন।
মা এমনভাবে নাড়ুদার দিকে তাকালেন, যেন তিনি বলছেন, *“তোমার ওপর ছেড়ে দিলে আজ আমাদের বংশের মান-সম্মান কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, সেটা ঈশ্বরই জানেন!”*
অবশেষে অনেকটা অনিচ্ছা নিয়েই চিনি ছাড়া চা তৈরি হলো।
চা পরিবেশন করা হলো।
আমরা তখন তাকিয়ে আছি নাড়ুদার দিকে।
নাড়ুদা কী করেন, সেটাই দেখার বিষয়।
সবাইকে চা দেওয়া শেষ হতেই নাড়ুদা হঠাৎ গলা পরিষ্কার করে বললেন,
—একটা কথা বলে রাখি। চা বানানোর সময় একটা কাপে চিনি দিতে ভুল হয়ে গেছে। কিন্তু কোন কাপে চিনি দেওয়া হয়নি, সেটা আমরা বুঝতে পারছি না।
সবাই চুপ।
নাড়ুদা আবার বললেন,
—তাই যার কাপে চিনি নেই, তিনি কোনো রকম লজ্জা করবেন না। শুধু বলবেন, আমরা সঙ্গে সঙ্গে চিনি দিয়ে দেব।
এই বলে নাড়ুদা এমন একটা নিরীহ মুখ করলেন, যেন তিনি অতিথিদের জন্য নয়, দেশের কোনো গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার ফলাফল ঘোষণা করছেন।
আমি তখন মনে মনে ভাবছি—এবার দেখা যাক বাঙালির আত্মসম্মান জেতে, নাকি চায়ের চিনি!
অতিথিরা চা খাওয়া শুরু করলেন।
একজন কাপের দিকে তাকালেন।
আরেকজন এক চুমুক দিলেন।
আরেকজন হয়তো মনে মনে বললেন, *“চা তো চিনি ছাড়া!”*
কিন্তু মুখে কিছু বললেন না।
কেউ বললেন না,
—আমার কাপে চিনি নেই।
পাঁচ মিনিট গেল।
দশ মিনিট গেল।
কেউ কিছু বলছেন না।
বরং একজন হঠাৎ বলে উঠলেন,
—বাহ! চা বেশ ভালো হয়েছে।
আরেকজন সঙ্গে সঙ্গে সমর্থন করলেন,
—হ্যাঁ, খুব ভালো হয়েছে।
তৃতীয়জনও বললেন,
—অনেক দিন পর এমন চা খেলাম!
আমি তখন বুঝলাম, চিনি না থাকলেও বাঙালির সামাজিক সৌজন্যের অভাব নেই।
সবাই চিনি ছাড়া চা শেষ করলেন। কেউ একবারের জন্যও বললেন না যে তাঁর কাপে চিনি নেই।
নাড়ুদা নির্বিকারভাবে বসে আছেন।
মায়ের মুখে তখন ধীরে ধীরে হাসি ফুটছে।
বৌদিও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে।
আর আমি নাড়ুদার দিকে তাকিয়ে ভাবছি—লোকটা আসলে চা বানাতে জানে না, কিন্তু মানুষ সামলাতে জানে!
শেষ পর্যন্ত নতুন আত্মীয়দের আপ্যায়নও হলো, বাড়ির মান-সম্মানও রক্ষা পেল, কারও কাছে চিনি না থাকার বিষয়টিও ধরা পড়ল না।
উল্টো সবাই চায়ের প্রশংসা করে গেলেন।
আর সবচেয়ে বড় কথা—
চিনির টাকাটাও বেঁচে গেল!
সেদিনই বুঝেছিলাম, নাড়ুদার কাছে পৃথিবীর এমন কোনো সমস্যা নেই, যার অন্তত একটা হাস্যকর সমাধান নেই।
আর চিনি না থাকলে?
চিনি ছাড়াই চা খাওয়ানোর মতো আত্মবিশ্বাস থাকলেই হলো!


No comments:
Post a Comment