নাড়ুদা ও সরকারি চাকরিজীবী জামাই - Jamini Kishore Roy

Post Top Ad

নাড়ুদা ও সরকারি চাকরিজীবী জামাই

Share This

নাড়ুদা ও সরকারি চাকরিজীবী জামাই

বেশ কিছুদিন নাড়ুদার সঙ্গে কথা হয় না। নাড়ুদার সঙ্গে কথা না হলে কেমন যেন মনে হয়, জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ সংবাদপত্র বন্ধ হয়ে আছে। তাই এক সকালে ভাবলাম, মানুষটাকে একটা ফোনই করি।

jamini


ফোন করতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো কেমন একটা হইচই—চেঁচামেচি, মানুষের কথাবার্তা, মাঝেমধ্যে কারও উত্তেজিত গলা।


আমি বললাম,


—কী ব্যাপার নাড়ুদা? এত গোলমাল কিসের?


নাড়ুদা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,


—আর বলিস না। আমাদের পাড়ায় গতরাতে একটা মেয়ের বিয়ে হয়েছে।


আমি বললাম,


—তাই বলে সকালে এত হইচই কেন?


নাড়ুদা বলল,


—বিয়েটা এমন হয়েছে যে, বিয়ের খবর শুনলে পাশের গ্রামের মানুষও মনে করবে রাজবাড়িতে রাজকন্যার বিয়ে হয়েছে!


আমি একটু আগ্রহ নিয়ে বললাম,


—কেমন বিয়ে?


নাড়ুদা শুরু করল তার স্বভাবসিদ্ধ বর্ণনা।


—মেয়ের বাবা প্রায় কুড়ি লাখ টাকা যৌতুক দিয়েছেন। তার সঙ্গে গহনা, আসবাবপত্র, কত কী! বাড়ির সাজসজ্জা দেখে মনে হয়েছে, বিয়ে নয়—কোনো মন্ত্রীর ছেলের সংবর্ধনা অনুষ্ঠান। খাবারের আইটেমের তো কোনো শেষ নেই। একটার নাম বললে আরেকটা বের হয়।


আমি বললাম,


—বাহ! তা বর কেমন?


নাড়ুদা বলল,


—বর সরকারি চাকরিজীবী।


আমি বললাম,


—ওহ! তাই তো! সরকারি চাকরিজীবী জামাই বলে কথা!


নাড়ুদা বলল,


—শুধু সরকারি চাকরিই নয়, জামাইকে আবার দামি একটা মোটরবাইকও দেওয়া হয়েছে।


আমি বললাম,


—তাহলে তো মেয়ের বাবা-মা খুশি, মেয়ে খুশি, বর খুশি, বরের বাবা-মা খুশি—সবাই খুশি!


নাড়ুদা বলল,


—খুশি হবে না কেন? এক পক্ষের মেয়ে বিয়ে হলো, আরেক পক্ষের ছেলে বউয়ের সাখে সাথে রাজত্ব পেল !


আমি হেসে বললাম,


—তা মেয়ের বাবা এত টাকা পেল কোথায়?


নাড়ুদা বলল,


—গোয়ালের গরু বিক্রি করেছে, বাঁশ বিক্রি করেছে, গাছ বিক্রি করেছে, কিছু জমিও বিক্রি করেছে।


আমি বললাম,


—বাহ! কী চমৎকার! মেয়ের বিয়ে উপলক্ষে বাড়ির যা কিছু ছিল, সবকিছুকেই যেন বিদায় দেওয়া হলো!


নাড়ুদা এবার একটু চুপ করে বলল,


—ঘটনা আসলে অন্য জায়গায়।


আমি বললাম,


—কী হয়েছে?


নাড়ুদা বলল,


—এই যে এতক্ষণ ধরে যে বিয়ের মহিমা শুনলে, তার শেষটা শুনলে আমাদের সমাজের আসল চেহারা দেখা যাবে।


আমি কান খাড়া করলাম।


—বল।


নাড়ুদা বলল,


—যে পুরোহিত সারারাত জেগে মন্ত্র পড়ে বিয়েটা সম্পন্ন করলেন, তাঁর দক্ষিণার টাকা এখনো দেওয়া হয়নি।


আমি বললাম,


—কী বলিস!


—হ্যাঁ। মেয়ের বাবা বলছে, টাকা একটু কম আছে। কাল-পরশু দিয়ে দেবে।


আমি বললাম,


—এত আয়োজনের মধ্যে পুরোহিতের টাকা নেই?


নাড়ুদা বলল,


—পুরোহিতও সেটা মেনে নিতে পারছেন না। তাঁর কথা—“সারারাত কষ্ট করে বিয়ে পড়ালাম। বিয়েতে এত টাকা খরচ হলো, এত লোক খাওয়া-দাওয়া করল, জামাইকে মোটরবাইক দেওয়া হলো—আর আমার দক্ষিণার বেলায় টাকা নেই কেন?”


আমি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম।


তারপর বললাম,


—নাড়ুদা, ব্যাপারটা সত্যিই হাস্যকর।


নাড়ুদা বলল,


—হাস্যকর তো বটেই। তবে হাসির আড়ালে একটা কান্নাও আছে।


আমি বললাম,


—কী কান্না?


নাড়ুদা বলল,


—দেখ, আমরা কী চমৎকার সমাজ বানিয়েছি! মেয়ের বিয়েতে বিশ-পঁচিশ লাখ টাকা খরচ করতে পারি। গরু বিক্রি করতে পারি, গাছ কাটতে পারি, জমি বিক্রি করতে পারি। শুধু সরকারি চাকরিজীবী জামাইটা যেন হাতছাড়া না হয়!


তারপর একটু থেমে বলল,


—কিন্তু যে মানুষটা সারারাত বসে মন্ত্র পড়ে আমাদের বিয়েটা সম্পন্ন করল, তার দুই-তিন হাজার টাকা দিতে গেলেই আমাদের অর্থনীতি হঠাৎ ভেঙে পড়ে!


আমি হেসে বললাম,


—তা হলে সমস্যাটা টাকা নেই, নাকি টাকা কোথায় খরচ করতে হবে সেটা?


নাড়ুদা বলল,


—এই তো আসল কথা!


তারপর নাড়ুদা তার সেই বিখ্যাত ভঙ্গিতে বলল,


—আমাদের সমাজে টাকার অভাব নেই রে, অভাব হলো বোধের!


আমি চুপ করে গেলাম।


নাড়ুদা আবার বলল,


—মেয়েকে সুখী করতে চাই, ভালো কথা। কিন্তু সুখ কি শুধু সরকারি চাকরির বেতন দিয়ে কেনা যায়? আর যৌতুক দিয়ে যে সংসারের শুরু, সেখানে মেয়েটার মর্যাদা কোথায়?


আমি বললাম,


—কথাটা ঠিক।


নাড়ুদা বলল,


—আর একটা কথা মনে রাখিস। যৌতুক শুধু মেয়ের বাবাকে নিঃস্ব করে না, এটা একটা সামাজিক প্রতিযোগিতাও তৈরি করে। একজন বিশ লাখ দিল, আরেকজন ভাববে—আমাকেও তার চেয়ে বেশি দিতে হবে। একজন মোটরবাইক দিল, আরেকজন গাড়ি দেওয়ার চিন্তা করবে। এভাবে বিয়েটা আর বিয়ে থাকে না—এটা হয়ে যায় সামাজিক প্রদর্শনীর মেলা।


আমি বললাম,


—তাহলে মেয়ের বিয়েতে কী করা উচিত?


নাড়ুদা বলল,


—বিয়ে করবি, আনন্দ করবি, আত্মীয়স্বজনকে খাওয়াবি—সবই কর। কিন্তু ধার করে, জমি বিক্রি করে, গরু-বাছুর বিক্রি করে, নিজের ভবিষ্যৎ নষ্ট করে কারও চাকরি কিনতে যাস না।


তারপর হেসে বলল,


—আর একটা কথা—


—কী?


—বিয়ের বাজেট করার সময় পুরোহিতের দক্ষিণাটা সবার শেষে রাখিস না। লোকটা যদি রাগ করে মন্ত্রের মাঝখানে উঠে চলে যায়, তখন কিন্তু সরকারি চাকরিজীবী জামাইও বিয়ে করতে পারবে না!


আমি হেসে ফেললাম।


ওপাশ থেকেও নাড়ুদার হাসির শব্দ শোনা গেল।


কিন্তু হাসির পরই নাড়ুদা বলল,


—আমরা হাসছি ঠিকই, কিন্তু ব্যাপারটা সিরিয়াস। একটা মেয়ের বিয়ে যেন তার বাবার সর্বস্বান্ত হওয়ার কারণ না হয়। আর একটা ছেলের সরকারি চাকরি যেন তার বাজারদর না হয়।


কথাটা শুনে আমি আর কিছু বলতে পারলাম না।


সকালের সেই ফোনকলটা শেষ হলো হাসি দিয়ে, কিন্তু নাড়ুদার শেষ কথাটা মাথায় থেকে গেল—


বিয়েতে মানুষের আনন্দ থাকা উচিত, পণ্যের দরদাম নয়। জামাইয়ের চাকরি দেখা যেতে পারে, কিন্তু তার সঙ্গে মানুষের দাম নির্ধারণ করা উচিত নয়।


আর মনে মনে ভাবলাম—নাড়ুদা আসলে শুধু গল্প বলে না। গল্পের ফাঁকে ফাঁকে আমাদের সমাজের আয়নাটাও সামনে ধরে।

No comments:

Post a Comment

Post Bottom Ad

Pages