নাড়ুদার প্রথম পরামর্শ: মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখুন
চাকরিজীবনের একেবারে শুরুর দিকের কথা। নতুন চাকরিতে যোগ দিয়েছি। নতুন অফিস, নতুন মানুষ, নতুন পরিবেশ—সবকিছুই তখন আমার কাছে অপরিচিত। কে কেমন মানুষ, কার সঙ্গে কীভাবে কথা বলতে হবে, কার সঙ্গে কতটা ঘনিষ্ঠ হওয়া উচিত—এসব নিয়ে মনে নানা প্রশ্ন।
কথায় কথায় একদিন নাড়ুদার কাছে পরামর্শ চাইলাম,
—অফিসের মানুষের সঙ্গে কীভাবে চলব? কার সঙ্গে কেমন ব্যবহার করব?
নাড়ুদা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—একটা কথা মনে রাখিস। অফিসে যে কোনো পদের মানুষকে কখনো ছোট করে দেখবি না।
আমি মন দিয়ে শুনতে লাগলাম।
নাড়ুদা বলল,
—পিয়ন থেকে ড্রাইভার, লোডার থেকে ক্লিনার, সুইপার থেকে অফিসার—প্রত্যেক মানুষকে তার অবস্থান থেকে সম্মানের চোখে দেখবি। এমন ভাববি না যে, বড় পদের মানুষকে বেশি সম্মান করতে হবে আর ছোট পদের মানুষকে কম। একজন প্রকৃত মানুষ মানুষের পদ দিয়ে তার সম্মান নির্ধারণ করে না।
আমি বললাম,
—কিন্তু অফিসে তো পদ অনুযায়ী দায়িত্ব ও ক্ষমতার পার্থক্য থাকেই।
নাড়ুদা বলল,
—অবশ্যই থাকে। পদের দায়িত্ব আলাদা, মানুষের মর্যাদা আলাদা।এই দুইটা গুলিয়ে ফেলিস না।
কথাটা আমার মনে দাগ কেটে গেল।
নাড়ুদা আবার বলল,
—একটা প্রতিষ্ঠান কখনো শুধু অফিসার দিয়ে চলে না। একজন অফিসার পরিকল্পনা করতে পারেন, কিন্তু সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে আরও অনেক মানুষের প্রয়োজন হয়। ড্রাইভার গাড়ি চালান, ক্লিনার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখেন, লোডার মালামাল ওঠানামা করেন, সুইপার পরিবেশ পরিষ্কার রাখেন, পিয়ন নানা গুরুত্বপূর্ণ কাজে সহযোগিতা করেন। প্রত্যেকের কাজ আলাদা, কিন্তু প্রতিষ্ঠানটা সবার কাজ মিলিয়েই দাঁড়িয়ে থাকে।
তারপর একটা উদাহরণ দিয়ে বলল,
—বল তো, একজন সুইপারের বিকল্প কি একজন লোডার হতে পারে?
আমি বললাম,
—না।
—একজন ড্রাইভারের জায়গায় একজন ইলেকট্রিশিয়ানকে বসানো যাবে?
—না।
—তাহলে যে কাজটা যার দায়িত্ব, সেই কাজের গুরুত্বও তো তার জায়গায় গুরুত্বপূর্ণ।
আমি মাথা নেড়ে সম্মতি জানালাম।
নাড়ুদা এবার একটু গম্ভীর হয়ে বলল,
—আর একটা জিনিস কখনো করবি না—কাউকে তুই-তুকারি’ করে, তাচ্ছিল্য করে বা অপমানজনকভাবে সম্বোধন করবি না। বিশেষ করে কর্মক্ষেত্রে।
আমি একটু দ্বিধা নিয়ে বললাম,
—পিয়নদের কি ‘আপনি’ বলে সম্বোধন করতে হবে?
নাড়ুদা আমার দিকে তাকিয়ে হেসে বলল,
—পিয়ন হলে কি মানুষ থাকে না?
আমি চুপ।
—ক্লিনার হলে কি তার সম্মান থাকে না? সুইপার হলে কি তার পরিবার নেই? তারও তো আত্মসম্মান আছে। তুই অফিসার বা কর্মচারী—যাই হোস না কেন, তোর পদের সঙ্গে তার পদের পার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু মানুষ হিসেবে তার মর্যাদা তোর চেয়ে একটুও কম নয়।
কথাটা বলেই নাড়ুদা একটু থামল।
তারপর বলল,
—তুই তাকে সম্মান দিয়ে কথা বলবি। দেখবি, সেও তোকে সম্মান দিয়ে কথা বলবে।
আমি বললাম,
—সবাই কি তা করবে?
নাড়ুদা বলল,
—সবাই করবে না। কিন্তু তুই নিজের আচরণটা ঠিক রাখবি। অন্যের আচরণ দিয়ে নিজের চরিত্রের মান নির্ধারণ করবি না।
তারপর এমন একটা কথা বলল, যেটা আজও আমার মনে আছে—
তুমি সম্মান দেবে না, অথচ সম্মান প্রত্যাশা করবে—এটা কী করে হয়? পৃথিবীটা Give and Take-এর। কিছু পেতে হলে কিছু আগে দিতে হয়।
চাকরিজীবনের শুরুতে নাড়ুদার দেওয়া এই পরামর্শটি আমার কাছে শুধু একটি পরামর্শ ছিল না; ধীরে ধীরে এটি আমার কর্মজীবনের একটি নীতিতে পরিণত হয়েছে।
আজ এত বছর পরও আমি চেষ্টা করি অফিসের প্রতিটি পদের মানুষকে সম্মান দিয়ে কথা বলতে। পিয়ন, ড্রাইভার, লোডার, ক্লিনার, সুইপার—কেউ আমার কাছে শুধুই একটি পদ নয়; প্রত্যেকেই একটি মানুষ, যার নিজের দায়িত্ব আছে, আত্মসম্মান আছে, পরিবার আছে, স্বপ্ন আছে।
তবে কর্মজীবনে চলতে গিয়ে একটা বিষয় খুব কাছ থেকে দেখেছি।
কিছু মানুষ পদ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যেন নিজের উচ্চতাও মেপে ফেলেন। পদ যত বড় হয়, কথাবার্তায় অহংকারও তত বড় হতে থাকে। অধস্তন কর্মচারীদের সঙ্গে এমনভাবে কথা বলেন, যেন সম্মান পাওয়ার অধিকার শুধু তাঁদেরই আছে।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, অন্যকে ছোট করতে গিয়ে মানুষ কখনো বড় হয় না।
বরং অফিসে কে কেমন ব্যবহার করেন, মানুষ তা খুব ভালোভাবেই মনে রাখে। সামনে হয়তো কেউ কিছু বলে না, মাথা নিচু করে কাজ করে যায়। কিন্তু আড়ালে সেই আচরণ নিয়েই আলোচনা হয়। অনেক সময় দেখা যায়, যে মানুষটি নিজেকে সবার চেয়ে বড় মনে করেন, তার অনুপস্থিতিতে অন্যরা তার পদ নিয়ে নয়, তার ব্যবহার নিয়ে কথা বলেন।
কারণ পদ মানুষকে কিছুদিনের জন্য ক্ষমতা দিতে পারে, কিন্তু ভালো ব্যবহার মানুষকে দীর্ঘদিনের জন্য সম্মান দেয়।
একজন অফিসার অবসর নিলে তার পদটি অন্য কেউ পেয়ে যায়। একজন ম্যানেজার চলে গেলে আরেকজন ম্যানেজার আসেন। পদটি থেকে যায়, মানুষটি চলে যায়।
কিন্তু একজন মানুষ কর্মজীবনে অন্যদের সঙ্গে কেমন ব্যবহার করে গেছেন—সেটা অনেক দিন থেকে যায় মানুষের মনে।
তাই কর্মক্ষেত্রে বড় হওয়ার পাশাপাশি ভালো মানুষ হওয়াটাও জরুরি।
আপনি একজন অফিসার হতে পারেন, ম্যানেজার হতে পারেন, জিএম হতে পারেন কিংবা প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ পদে থাকতে পারেন। আপনার অধীনে অনেক মানুষ কাজ করতে পারে। কিন্তু অফিসের গেট দিয়ে বের হওয়ার পর আপনিও একজন মানুষ, তারাও মানুষ।
পদ আপনাকে দায়িত্ব দিয়েছে, মানুষের ওপর শ্রেষ্ঠত্বের অধিকার দেয়নি।
আজও নাড়ুদার সেই কথাগুলো মনে পড়ে—
পদের পার্থক্য থাকবে, দায়িত্বের পার্থক্য থাকবে, বেতনের পার্থক্য থাকবে; কিন্তু সম্মানের ক্ষেত্রে মানুষকে ছোট করে দেখার কোনো কারণ নেই।
সত্যিই তো—একটি প্রতিষ্ঠানের বড় চেয়ারটি যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক, সেই চেয়ারকে ঘিরে কাজ করা ছোট-বড় অসংখ্য মানুষের সম্মিলিত শ্রম ছাড়া প্রতিষ্ঠানটি একদিনও চলবে না।
তাই কর্মক্ষেত্রে কাউকে ছোট করে নয়, সম্মান দিয়ে কথা বলুন।
কারণ আপনি আজ যাকে নিচু পদের মানুষ ভেবে অবহেলা করছেন, সে হয়তো আপনার প্রতিষ্ঠানের এমন একটি কাজ করে যাচ্ছে, যার অনুপস্থিতি আপনি একদিনেই বুঝতে পারবেন।
আর সবচেয়ে বড় কথা—
মানুষকে সম্মান করতে কোনো বড় পদ লাগে না। লাগে শুধু একটি সুন্দর মন।
নাড়ুদা আমাকে চাকরির শুরুতেই যে শিক্ষাটি দিয়েছিল, কর্মজীবনের এত বছর পর বুঝতে পারছি—সেটি শুধু অফিসে চলার নিয়ম নয়, জীবনে মানুষ হয়ে চলারও একটি বড় শিক্ষা।


No comments:
Post a Comment