নাড়ুদার ক্যান্টিন তত্ত্ব
একদিন অফিসের নানা বিষয় নিয়ে নাড়ুদার সঙ্গে গল্প করছিলাম। কথায় কথায় আমাদের কারখানার নতুন চালু হওয়া ক্যান্টিনের প্রসঙ্গ উঠে এলো।
আমি বললাম,
—আমাদের অফিসে শ্রমিকদের জন্য ক্যান্টিন চালু হয়েছে। নতুন জিএম সাহেব এমডি স্যারকে বুঝিয়েছেন, ক্যান্টিন থাকলে শ্রমিকরা গেট পাস নিয়ে বাইরে কম যাবে। এতে কর্মঘণ্টা বাঁচবে, উৎপাদন বাড়বে এবং প্রতিষ্ঠানেরও লাভ হবে।
নাড়ুদা মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন।
হঠাৎ প্রশ্ন করলেন,
—তোমাদের ওখানে মোট শ্রমিক কতজন?
—প্রায় পনেরশত।
—আর প্রতিদিন কতগুলো গেট পাস ইস্যু হয়?
—আড়াইশ থেকে তিনশ। কোনো কোনো দিন আরও বেশি।
—একেকজন কতক্ষণ বাইরে থাকে?
—গড়ে দশ থেকে পনের মিনিট।
নাড়ুদা একটু চুপ করে রইলেন। বুঝলাম, তাঁর মাথার ভেতর হিসাবের ক্যালকুলেটর চালু হয়ে গেছে।
তারপর বললেন,
—ধর, প্রতিদিন ৩৫০ জন শ্রমিক ১৫ মিনিট করে বাইরে যায়।
তিনি মাটিতে আঙুল দিয়ে অঙ্ক কষার ভঙ্গিতে বলতে লাগলেন,
৩৫০ × ১৫ = ৫২৫০ মিনিট
৫২৫০ ÷ ৬০ = ৮৭.৫ ঘণ্টা
—অর্থাৎ প্রতিদিন প্রায় ৮৮ কর্মঘণ্টা বাইরে চলে যাচ্ছে। যদি প্রতি ঘণ্টার গড় শ্রমমূল্য ১০০ টাকা ধরা হয়, তাহলে প্রতিদিন প্রায় ৮,৭৫০ টাকার সমপরিমাণ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে।
আমি মাথা নেড়ে বললাম,
—ঠিকই তো।
নাড়ুদা আবার হিসাব করলেন,
—মাসে ২৬ কর্মদিবস ধরলে ৮,৭৫০ × ২৬ = ২,২৭,৫০০ টাকা।
তারপর হেসে বললেন,
—দেখ, এটা কিন্তু খুব সাধারণ হিসাব। এখানে উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, কাজের ধারাবাহিকতা নষ্ট হওয়া কিংবা সুপারভাইজারদের অতিরিক্ত সময় ব্যয়ের হিসাব ধরা হয়নি।
আমি বললাম,
—তাহলে ক্যান্টিন চালু করা তো ভালো সিদ্ধান্ত?
নাড়ুদা বললেন,
—অবশ্যই ভালো সিদ্ধান্ত। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ক্যান্টিনটা কি শ্রমিকদের প্রয়োজন পূরণ করতে পারছে?
আমি বললাম,
—এখন বিস্কুট, চানাচুর, ড্রাই কেক, রুটি, প্যাকেটজাত মুড়ি আর ডালভাজা পাওয়া যায়।
নাড়ুদা জিজ্ঞেস করলেন,
—চা আছে?
—না।
—কফি?
—না।
—কলা, দই, ঠান্ডা পানীয়?
—না।
—আইসক্রিম?
—না।
—সিগারেট-বিড়ির জন্য কোনো নির্ধারিত স্মোকিং জোন?
—না।
নাড়ুদা এবার মুচকি হেসে বললেন,
—তাহলে শ্রমিকরা বাইরে যাবে না কেন?
আমি বললাম,
—মানে?
নাড়ুদা বললেন,
—দেখ, অধিকাংশ মানুষ শুধু বিস্কুট খাওয়ার জন্য বাইরে যায় না। কেউ যায় চা খেতে, কেউ ধূমপান করতে, কেউ একটু হাঁটতে, কেউ সহকর্মীদের সঙ্গে আড্ডা দিতে। মানুষের প্রয়োজন শুধু পেটের নয়, অভ্যাসেরও।
আমি চুপ করে শুনতে লাগলাম।
নাড়ুদা বললেন,
—যদি একজন শ্রমিকের প্রধান উদ্দেশ্য হয় এক কাপ চা আর একটা সিগারেট, তাহলে ক্যান্টিনে বিস্কুট থাকলেও সে বাইরে যাবে। ফলে গেট পাস কমার যে লক্ষ্য ছিল, সেটা পুরোপুরি অর্জিত হবে না।
তারপর আরও একটি ভিন্ন দিক তুলে ধরলেন।
—আরেকটা বিষয় খেয়াল করেছ?
—কি?
—এতদিন যারা বাইরে যেত না, বিশেষ করে অনেক নারী শ্রমিক, তারা এখন ক্যান্টিনে আসবে। কারণ ক্যান্টিন এখন প্রতিষ্ঠানের ভেতরেই আছে। ফলে নতুন কিছু অভ্যন্তরীণ যাতায়াত তৈরি হবে।
আমি বললাম,
—তাহলে তো উল্টো কর্মঘণ্টা আরও নষ্ট হতে পারে!
নাড়ুদা বললেন,
—ঠিক তাই। তাই শুধু ক্যান্টিন চালু করলেই হবে না, এর উদ্দেশ্য কী, সেটাও বুঝতে হবে।
তিনি একটু থেমে আবার বললেন,
—ব্যবস্থাপনায় একটা কথা আছে—মানুষকে যেখানে রাখতে চাও, সেখানে তার প্রয়োজনীয় সুবিধাও দিতে হবে।
যদি কর্মীদের বাইরে যাওয়া কমাতে চাও, তাহলে ভেতরে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে যেখানে তাদের বেশিরভাগ প্রয়োজন পূরণ হয়।
আমি বললাম,
—তাহলে তোমার মতে কী করা উচিত?
নাড়ুদা বললেন,
—প্রথমত, স্বাস্থ্যসম্মত চা ও পানীয়ের ব্যবস্থা থাকতে হবে।
—দ্বিতীয়ত, ফল, দই, হালকা খাবারের মতো কিছু পুষ্টিকর আইটেম রাখতে হবে।
—তৃতীয়ত, যারা ধূমপান করেন তাদের জন্য নিরাপদ ও নির্দিষ্ট স্মোকিং জোনের কথা ভাবা যেতে পারে, যাতে তারা অকারণে গেট পাস নিয়ে বাইরে না যায়।
—চতুর্থত, ক্যান্টিনকে শুধু খাবার বিক্রির জায়গা না ভেবে কর্মীদের কল্যাণমূলক সেবার অংশ হিসেবে দেখতে হবে।
আমি বললাম,
—তাহলে ক্যান্টিন আসলে শুধু ব্যবসা নয়?
নাড়ুদা বললেন,
—একদমই না। ভালো ক্যান্টিন কর্মীদের সন্তুষ্টি বাড়ায়, কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ উন্নত করে, অনুপস্থিতি কমায় এবং দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে সাহায্য করে।
তারপর হেসে বললেন,
—তবে আরেকটা কথা মনে রাখিস।
—কী কথা?
—শুধু ক্যান্টিন বানালেই হবে না। শ্রমিক যদি সেখানে গিয়ে দেখে চা নেই, তাহলে সে আবার গেটের বাইরে গিয়ে চায়ের দোকানেই বসবে!
আমি হেসে ফেললাম।
ফোন রাখার পরও নাড়ুদার কথাগুলো মাথায় ঘুরতে লাগল।
আমি একজন ক্ষুদ্র কর্মচারী। আমার কথা হয়তো সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের কানে পৌঁছাবে না। কিন্তু নাড়ুদার যুক্তিগুলো ভাবতে গিয়ে বুঝলাম, অনেক সময় কোনো ব্যবস্থার সফলতা শুধু তার অস্তিত্বে নয়, বরং মানুষের প্রকৃত প্রয়োজন কতটা পূরণ করতে পারছে তার ওপর নির্ভর করে।
ক্যান্টিনের উদ্দেশ্য যদি কর্মীদের সুবিধা দেওয়া এবং কর্মঘণ্টার অপচয় কমানো হয়, তাহলে ক্যান্টিনকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে যাতে মানুষ স্বেচ্ছায় বাইরে না গিয়ে ভেতরেই প্রয়োজন মেটাতে পারে।
নাড়ুদা যেমন বলেছিলেন,
দেয়াল তুললেই মানুষকে আটকে রাখা যায় না; প্রয়োজন মেটাতে পারলেই মানুষ নিজের ইচ্ছায় থেকে যায়।


No comments:
Post a Comment