৪৪০ ভোল্টের তারে সড়ে তিন ঘণ্টা
সকালে ঘুম থেকে উঠেই নাড়ুদার ফোন।
ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে রহস্যময় গলায় বলল,
—জানিস, গত রাতে মরতে মরতে বেঁচে গেছি!
আমি আঁতকে উঠলাম।
—কি বল! কোথায়? কীভাবে?
নাড়ুদা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
—স্বপ্নের মধ্যে।
আমি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম।
—ওহ! তাই বল। আমি তো ভাবলাম সত্যি সত্যি কিছু হয়েছে।
নাড়ুদা বলল,
—স্বপ্ন হলেও ঘটনা কিন্তু ভয়ংকর ছিল। তুই শুনলে অবাক হয়ে যাবি।
আমি বললাম,
—আচ্ছা, বল দেখি।
নাড়ুদা শুরু করল।
স্বপ্নে সে নাকি ভয়ংকর এক যুদ্ধে নেমেছে। শত্রুপক্ষের সঙ্গে এমন যুদ্ধ, যেন পৃথিবীর ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে নাড়ুদার জয়ের ওপর।
গুলি চলছে।
বোমা পড়ছে।
চারদিকে ধোঁয়া।
আর নাড়ুদা একাই শত্রুদের নাজেহাল করে দিচ্ছে।
একপর্যায়ে শত্রুপক্ষের একটি হেলিকপ্টার উড়ে যেতে দেখে নাড়ুদা সিদ্ধান্ত নিল, হেলিকপ্টারটাকেই আটকাবে।
হেলিকপ্টার উড়ল।
নাড়ুদা ধরল।
হেলিকপ্টার ওপরে উঠল।
নাড়ুদা ঝুলে রইল।
হেলিকপ্টার ডানে গেল।
নাড়ুদা ডানে গেল।
হেলিকপ্টার বাঁয়ে গেল।
নাড়ুদা বাঁয়ে গেল।
হেলিকপ্টারের পাইলট পর্যন্ত নাকি ভয় পেয়ে গেছে—"এ লোকটা মানুষ, না আঠা!"
অবশেষে হাত ফসকে নাড়ুদা নিচে পড়তে শুরু করল।
পড়ছে তো পড়ছেই।
পৃথিবী যেন শেষই হচ্ছে না।
হঠাৎ গিয়ে পড়ল বিদ্যুতের তারের ওপর।
একটা না, দুটো না—অনেকগুলো তার।
৪৪০ ভোল্টের লাইন!
নাড়ুদা তার আঁকড়ে ঝুলে আছে।
নিচে পুকুর।
উপরে আকাশ।
মাঝখানে নাড়ুদা।
কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার—কোনো শক নেই!
কোনো ঝাঁকুনি নেই!
কিছুই নেই!
আমি বললাম,
—তারপর?
নাড়ুদা বলল,
—প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা ঝুলে আছি।
আমি বললাম,
—তিন ঘণ্টা?
—হ্যাঁ।
—এই সাড়ে তিন ঘণ্টায় একবারও বিদ্যুৎ এলো না?
নাড়ুদা বলল,
—সেটাই তো রহস্য!
তারপর স্বপ্নে কিছু লোক এসে বলল,
—ভয় পাবেন না। এখানে এমনই হয়। এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে, তিন ঘণ্টা থাকে না। আপনি নিশ্চিন্তে ঝুলে থাকুন।
আমি বললাম,
—এটা তো স্বপ্ন না, বাস্তবতার সরকারি বিজ্ঞপ্তি মনে হচ্ছে!
নাড়ুদা বলল,
—আমি তখনও বুঝিনি।
তারপর ওরা বলল,
—চিন্তা করবেন না। বিদ্যুৎ আসার সম্ভাবনা খুবই কম। আপনি চাইলে আরও কিছুক্ষণ ঝুলে থাকতে পারেন।
আমি বললাম,
—তারপর?
—আমি সাহস করে পুকুরে লাফ দিলাম।
আর ঠিক তখনই ঘুম ভেঙে গেল।
দেখি আমি খাট থেকে লাফ দিয়ে মেঝেতে পড়ে আছি!
আমি হাসতে হাসতে বললাম,
—তা হলে বিদ্যুতের তারে সাড়ে তিন ঘণ্টা ঝুলে থেকেও কিছু হলো না, কিন্তু খাট থেকে পড়ে ব্যথা পেলে?
নাড়ুদা বলল,
—এই তো জীবনের সবচেয়ে বড় রহস্য!
কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বলল,
—ভাব তো, স্বপ্নেও এখন বিদ্যুতের তারকে মানুষ ভয় পায় না। কারণ মানুষের বিশ্বাস হয়ে গেছে, তারে বিদ্যুৎ থাকার চেয়ে না থাকার সম্ভাবনাই বেশি!
আমি বললাম,
—কথাটা কিন্তু খারাপ বল নি ।
নাড়ুদা বলল,
—একসময় মানুষ বলত, "সাবধানে যেও, বিদ্যুতের তার আছে।"
এখন বলে,
—"সাবধানে যেও, হঠাৎ যদি বিদ্যুৎ চলে আসে!"
আমি হেসে ফেললাম।
নাড়ুদা আরও উৎসাহ পেল।
—আগে বিদ্যুৎ গেলে মানুষ বলত, "কখন আসবে?"
এখন বিদ্যুৎ এলে মানুষ বলে, "কখন যাবে?"
আমি বললাম,
—তা ঠিক।
নাড়ুদা বলল,
—আগে লোডশেডিং ছিল ব্যতিক্রম, এখন বিদ্যুৎ থাকাটাই অনেক জায়গায় ব্যতিক্রম হয়ে যাচ্ছে।
তারপর একটু দার্শনিক ভঙ্গিতে বলল,
—আমাদের দেশের মানুষ বড়ই অভিযোজনক্ষম। আগে ফ্যান বন্ধ হলে ঘুম ভাঙত। এখন ফ্যান চলতে থাকলে ঘুম ভাঙে—ভাবি, "বিদ্যুৎ এখনো আছে নাকি!"
আমি হেসে কুটিকুটি।
নাড়ুদা থামল না।
—আগে অতিথি এলে চা-বিস্কুট দেওয়া হতো। এখন অনেক জায়গায় প্রথম প্রশ্ন—
"বিদ্যুৎ আছে?"
চা পরে।
আমি বললাম,
—তা হলে তোমার স্বপ্নের শিক্ষাটা কী?
নাড়ুদা বলল,
—শিক্ষা খুব সহজ।
বিদ্যুতের তারে ঝুলে থাকলে হয়তো কিছু হবে না, কারণ সেখানে বিদ্যুৎ নাও থাকতে পারে।
কিন্তু খাট থেকে লাফ দিলে যে মেঝেতে পড়বি, সেটা শতভাগ নিশ্চিত!
তারপর একটু হেসে বলল,
—আরেকটা শিক্ষা আছে।
—কি?
—যে দেশে মানুষ স্বপ্নের মধ্যেও বিদ্যুতের তারে ঝুলে থেকে নির্ভয়ে তিন ঘণ্টা কাটিয়ে দেয়, সে দেশের মানুষকে আর আলাদা করে ধৈর্য শেখানোর প্রয়োজন নেই!
ফোন রেখে আমি অনেকক্ষণ হাসলাম।
তবে হাসির মাঝেও একটা বাস্তবতা মনে হলো।
লোডশেডিং নিয়ে আমরা হাসি, ঠাট্টা করি, গল্প বানাই। কিন্তু এর পেছনে লুকিয়ে থাকে মানুষের দৈনন্দিন ভোগান্তি—গরমে ঘুমহীন রাত, শিক্ষার্থীর পড়াশোনার সমস্যা, ব্যবসার ক্ষতি, উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং নিত্যদিনের অনিশ্চয়তা।
তবুও মানুষ বেঁচে থাকে।
হাসে।
গল্প করে।
আর নাড়ুদার মতো মানুষরা সেই কষ্টের মধ্যেও হাসির খোরাক খুঁজে নেয়।
কারণ বাঙালির এক অদ্ভুত ক্ষমতা আছে—
যে বিষয় নিয়ে কাঁদার কথা, সেটা নিয়েও একদিন গল্প বানিয়ে হাসতে পারে।


No comments:
Post a Comment