নাড়ুদা ও দুই কাপ চায়ের রহস্য - Jamini Kishore Roy

Post Top Ad

নাড়ুদা ও দুই কাপ চায়ের রহস্য

Share This

নাড়ুদা ও দুই কাপ চায়ের রহস্য

মানুষ মাত্রই ভুল করে। কেউ ভুল করে কথা বলে, কেউ ভুল করে কাজ করে, আবার কেউ কেউ এমন ভুল করে বসে যে পরে সেই ভুল ঢাকতে গিয়ে আরও বড় কাহিনী সৃষ্টি হয়ে যায়। তবে সব ভুল স্বীকার করাই যে সবসময় বুদ্ধিমানের কাজ, এমন কথাও জোর দিয়ে বলা যায় না। অন্তত নাড়ুদার মতে তো নয়ই!

naruda


ঘটনাটা ডোমার বাজারের বিখ্যাত কাল্টুর হোটেলের।


সেদিন নাড়ুদা নাকি কোনো একটা বিষয় নিয়ে খুব চিন্তিত ছিল। কী চিন্তা, সেটা আজও রহস্য। সম্ভবত রাষ্ট্রীয় বাজেট, আন্তর্জাতিক রাজনীতি অথবা পাশের বাড়ির ছাগল কেন হঠাৎ করে কম ডাকছে—এ জাতীয় কোনো গভীর বিষয়।


চিন্তা করতে করতে নাড়ুদা হোটেলে ঢুকল।


বসে বলল,


—দুই কাপ চা দেন।


হোটেল বয়ও বিনা প্রশ্নে মাথা নেড়ে চলে গেল।


কয়েক মিনিট পরে ট্রেতে করে দুই কাপ ধোঁয়া ওঠা চা এনে টেবিলে রেখে দিল।


চা দেখে নাড়ুদার বুকের ভেতর ধক করে উঠল।


কারণ তখনই তার মনে পড়ল—


সে একাই এসেছে!


দুই কাপ চা অর্ডার দেওয়া হয়েছে সম্পূর্ণ অসাবধানতাবশত।


মুহূর্তের মধ্যে তার আগের সব চিন্তা উধাও।


দেশ, সমাজ, অর্থনীতি—সব গিয়েছে।


এখন একটাই সমস্যা—


এই দ্বিতীয় কাপ চা নিয়ে কী করা যায়?


এক কাপ ফেরত দিলে হোটেল বয় বুঝে যাবে ভুল হয়েছে। ভুল স্বীকার করলে নিজের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হতে পারে। আর নাড়ুদা নিজের ভাবমূর্তি নিয়ে অত্যন্ত সংবেদনশীল মানুষ।


তাই সে প্রথম কাপে চুমুক দিতে দিতে পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করতে লাগল।


ঠিক তখনই বিপদ।


হোটেল বয় দূর থেকে জোরে জোরে বলে উঠল,


—দাদা, আপনার আরেকজন লোক কই? চা তো ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে!


এই এক বাক্যে হোটেলের অর্ধেক মানুষের দৃষ্টি গিয়ে পড়ল নাড়ুদার ওপর।


কেউ সিঙ্গারা মুখে নিয়ে তাকিয়ে আছে।


কেউ চায়ের কাপ নামিয়ে তাকিয়ে আছে।


কেউ আবার এমনভাবে তাকাচ্ছে, যেন দুই কাপ চা অর্ডার করা দেশের দণ্ডবিধিতে শাস্তিযোগ্য অপরাধ।


নাড়ুদার ভেতরে ভেতরে অস্বস্তি হলেও মুখে তার কোনো ছাপ নেই।


সে গম্ভীরভাবে হোটেল বয়কে কাছে ডাকল।


—আমি কি বলেছি আমার সঙ্গে আরেকজন আছে?


—না দাদা।


—তাহলে বললে কেন, "আরেকজন লোক কই?"


হোটেল বয় কিছুটা ঘাবড়ে গেল।


—না মানে... আপনি তো দুই কাপ চা অর্ডার দিয়েছিলেন... তাই ভাবলাম...


—কেন? একজন মানুষ কি দুই কাপ চা খেতে পারে না?


হোটেল বয় এবার পুরো হতবাক।


—একজন? দুই কাপ?


তার মুখের ভাব দেখে মনে হলো, সে জীবনে অনেক কিছু দেখেছে, কিন্তু এই দৃশ্য তার অভিজ্ঞতার বাইরে।


সে বলল,


—দাদা, এতদিন হোটেলে কাজ করি, জীবনে এমন দেখিনি।


নাড়ুদা তখন দার্শনিকের ভঙ্গিতে বলল,


—কত কিছুই তো দেখনি। তাই বলে কি জীবনে আর দেখবে না?


হোটেল বয় চুপ।


পাশের টেবিলের লোকজনও চুপ।


মনে হলো সবাই এখন ইতিহাসের সাক্ষী।


এরপর নাড়ুদা দ্বিতীয় কাপটা নিজের দিকে টেনে নিল।


ভেতরে ভেতরে হয়তো সে দ্বিতীয় কাপ চায়ের বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন করছে, কিন্তু মুখে তার কোনো প্রকাশ নেই।


চুমুক দিতে দিতে বলল,


—এই যে আমাকে দেখছেন, আমি একসঙ্গে দুই কাপ চা খাই। আজ থেকে আর অবাক হবেন না।


পাশের টেবিল থেকে একজন ফিসফিস করে বলল,


—বড্ড চা-খোর মানুষ বটে!


আরেকজন বলল,


—এমন লোকও আছে নাকি!


নাড়ুদা শুনেও না শোনার ভান করল।


সম্মানের প্রশ্ন এখন।


পিছিয়ে আসার উপায় নেই।


অবশেষে দ্বিতীয় কাপও শেষ হলো।


বিল মিটিয়ে নাড়ুদা এমন ভাব করে হোটেল থেকে বের হলো, যেন দুই কাপ চা খাওয়া পৃথিবীর সবচেয়ে স্বাভাবিক ব্যাপার।


যাওয়ার সময় বলল,


—শোনো, আগামীতে কেউ দুই কাপ চা অর্ডার করলে অবাক হবে না।


হোটেল বয় বলল,


—আচ্ছা দাদা, কিন্তু তিন কাপ অর্ডার করলে?


নাড়ুদা এক সেকেন্ড ভেবে বলল,


—তাহলে বুঝবে লোকটা আমার গুরু!


হোটেলের ভেতর চাপা হাসির ঢেউ বয়ে গেল।


নাড়ুদা দরজার কাছে গিয়ে একবার পিছনে তাকাল।


দেখল হোটেল বয়, ক্যাশিয়ার আর কয়েকজন খদ্দের এখনো তার দিকে তাকিয়ে আছে।

naruda


মনে হলো, তারা আজীবন এই ঘটনা ভুলবে না।


পরে একদিন নাড়ুদা আমাকে গল্পটা বলছিল।


আমি হেসে বললাম,


—তুমি তখন স্বীকার করে দিলেই তো পারতে যে ভুল করে দুই কাপ চা অর্ডার করেছ।


নাড়ুদা মাথা নেড়ে বলল,


—ওটাই তো তুমি বুঝলে না।


—কী?


—ভুল সবাই করে। কিন্তু সব ভুলের বিজ্ঞাপন দিতে নেই।


আমি বললাম,


—তাই বলে দুই কাপ চা খেয়ে ফেলতে হবে?


নাড়ুদা বলল,


—দেখ, দ্বিতীয় কাপ চা খাওয়া আমার জন্য কঠিন ছিল। কিন্তু হোটেল বয়ের সামনে নিজের ভুলোমনের পরিচয় দেওয়া তার চেয়েও কঠিন ছিল!


আমি হেসে কুটিকুটি।


নাড়ুদা আবার বলল,


—তবে একটা লাভ হয়েছিল।


—কী লাভ?


—যে টেনশন নিয়ে হোটেলে ঢুকেছিলাম, দুই কাপ চা শেষ করতে করতে সেটা কোথায় উধাও হয়ে গিয়েছিল, আজও জানি না!


আমি বললাম,


—অর্থাৎ টেনশনের ওষুধ দুই কাপ চা?


নাড়ুদা বলল,


—না। টেনশনের ওষুধ হলো নতুন টেনশন!


সত্যিই তো।


মানুষের জীবনে অনেক সময় এমন হয়। একটা চিন্তা মাথায় ঘুরতে থাকে। তারপর হঠাৎ আরেকটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটে, আর আগের চিন্তাটা কোথায় যেন হারিয়ে যায়।


আর নাড়ুদার কাছ থেকে সেদিন একটা শিক্ষাও পেলাম—


**ভুল করা লজ্জার নয়। তবে ভুল ঢাকতে গিয়ে এমন কাণ্ড করবেন না, যাতে পরে সেটা নিয়েই গল্প লিখতে হয়!**


যদিও নাড়ুদার ক্ষেত্রে সেই নিয়ম কখনোই খাটে না।


কারণ তিনি ভুল ঢাকতে গিয়ে যে গল্প তৈরি করেন, সেগুলোই পরে সবচেয়ে মজার গল্প হয়ে যায়।


No comments:

Post a Comment

Post Bottom Ad

Pages