পদবীর চেয়ে বড় পরিচয়
মানুষের জীবনে চাকরি পাওয়া যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ সেই চাকরির দায়িত্ব, কর্তব্য ও পেশাদারিত্ব সম্পর্কে সচেতন থাকা। আমরা অনেকেই চাকরি করি, পদবী ব্যবহার করি, অফিসে নিয়মিত যাই, কিন্তু নিজের দায়িত্বের পরিধি, আচরণবিধি এবং পেশাগত মূল্যবোধ সম্পর্কে কতটা জানি—সেই প্রশ্নের উত্তর সবসময় আশাব্যঞ্জক নয়।
কিছুদিন আগে নাড়ুদার সঙ্গে আড্ডা দিতে দিতে কর্পোরেট কালচার নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হচ্ছিল। নানা প্রসঙ্গের এক পর্যায়ে নাড়ুদা বলল,
—জানিস, চাকরি অনেকেই করে, কিন্তু কর্মক্ষেত্রে সুনাম অর্জন করতে পারে খুব কম মানুষ।
আমি বললাম,
—কেন? সবাই তো নিজের কাজই করে।
নাড়ুদা হেসে বলল,
—কাজ করাটাই সব নয়। কাজের ধরন, আচরণ, দায়িত্ববোধ আর অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগের পদ্ধতিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
আমি আগ্রহ নিয়ে শুনতে লাগলাম।
নাড়ুদা বলল,
—আমাদের সমাজে এমন অনেক মানুষ আছে, যারা মনে করে বড় পদে বসে থাকলেই সম্মান পাওয়া যায়। অথচ তারা ভুলে যায়, সম্মান পদবী থেকে আসে না, আসে আচরণ থেকে।
তারপর সে কয়েকটি উদাহরণ দিল।
—ধর, কাউকে অফিসের প্রয়োজনে ফোন করা হলো। তিনি ফোন দেখলেন, কিন্তু ধরলেন না। এটা স্বাভাবিক হতে পারে, কারণ সবাই সবসময় ফোন ধরতে পারেন না। কিন্তু পরে যদি তিনি একটি কল-ব্যাকও না করেন, তখন সেটা আর ব্যস্ততা থাকে না; সেটা দায়িত্বহীনতার পর্যায়ে পড়ে।
আমি মাথা নেড়ে সম্মতি জানালাম।
নাড়ুদা আবার বলল,
—আরও মজার বিষয় হলো, অনেককে মেসেজ দিলে তারা মেসেজ দেখেও উত্তর দেয় না। ই-মেইল করলে দিনের পর দিন কোনো জবাব নেই। কখনও কখনও মেইল পাঠানোর পর আবার ফোন করে বলতে হয়, "স্যার, একটা মেইল করেছি, একটু দেখে নিয়েন।"
কথাটা শুনে আমি হেসে ফেললাম।
কারণ বাস্তবে এমন ঘটনা প্রায়ই দেখা যায়।
নাড়ুদা বলল,
—এটা কিন্তু কোনোভাবেই পেশাদারিত্ব নয়। একজন সহকর্মী, অধঃস্তন বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা যদি তোমাকে ফোন, মেসেজ বা ই-মেইল করেন, তাহলে ধরে নিতে হবে তার প্রয়োজন আছে বলেই করেছেন। কেউ অফিসের কাজে কাউকে ফোন দেয় না গল্প করার জন্য, আর ই-মেইলও পাঠায় না সময় কাটানোর জন্য।
কথাগুলো খুব সাধারণ মনে হলেও এর ভেতরে গভীর সত্য লুকিয়ে আছে।
আসলে কর্মক্ষেত্রে যোগাযোগ একটি গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা। অনেক সময় একটি ছোট্ট উত্তর, একটি কল-ব্যাক বা একটি ই-মেইলের জবাব পুরো কাজের গতি বদলে দিতে পারে। আবার একটি উত্তর না দেওয়ার কারণে একটি ফাইল আটকে যেতে পারে, একটি সিদ্ধান্ত বিলম্বিত হতে পারে, এমনকি কোনো প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ক্ষতিও হতে পারে।
নাড়ুদা বলল,
—কিছু মানুষ মনে করে ফোন না ধরা, দেরিতে উত্তর দেওয়া বা নিজেকে খুব ব্যস্ত হিসেবে উপস্থাপন করা মানে নিজের গুরুত্ব বাড়ানো। বাস্তবে কিন্তু উল্টোটা হয়।
আমি বললাম,
—কীভাবে?
সে বলল,
—মানুষ তখন মনে মনে বুঝে যায়, এই ব্যক্তি কাজের চেয়ে গুরুত্ব দেখাতেই বেশি আগ্রহী। ফলে ধীরে ধীরে তার প্রতি আস্থা কমতে থাকে।
কথাটা সত্যিই ভেবে দেখার মতো।
কারণ একজন দক্ষ কর্মীকে মানুষ শুধু তার কাজের জন্য মনে রাখে না; তার সহযোগিতাপূর্ণ মনোভাব, দায়িত্ববোধ এবং সহজ যোগাযোগের জন্যও মনে রাখে।
আজকের প্রতিযোগিতামূলক কর্মজীবনে শুধুমাত্র জ্ঞান বা দক্ষতা যথেষ্ট নয়। একজন মানুষ কত দ্রুত সাড়া দেন, কতটা দায়িত্বশীল, কতটা সহযোগিতাপূর্ণ এবং কতটা পেশাদার আচরণ করেন—এসব বিষয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
একজন প্রকৃত পেশাজীবী জানেন, সব কল সঙ্গে সঙ্গে ধরা সম্ভব নয়। সব মেইলের উত্তরও মুহূর্তেই দেওয়া যায় না। কিন্তু তিনি এটাও জানেন যে, যোগাযোগের অপর প্রান্তে একজন মানুষ অপেক্ষা করছেন। তাই সুযোগ পেলে তিনি কল-ব্যাক করেন, মেসেজের উত্তর দেন, ই-মেইলের জবাব দেন এবং প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেন।
এতে তার সম্মান কমে না, বরং আরও বাড়ে।
দিনের শেষে মানুষ পদবী ভুলে যায়, চেয়ার ভুলে যায়, ক্ষমতা ভুলে যায়। কিন্তু একজন মানুষ কেমন ব্যবহার করতেন, কতটা সহযোগিতাপূর্ণ ছিলেন এবং অন্যদের প্রতি কতটা শ্রদ্ধাশীল ছিলেন—সেটা দীর্ঘদিন মনে রাখে।
নাড়ুদার সেই দিনের কথাগুলো আজও মনে আছে।
নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ করার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো অন্যকে অপেক্ষায় রাখা নয়; বরং সময়মতো সাড়া দিয়ে নিজেকে নির্ভরযোগ্য মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা।
সত্যিই তো, কর্মক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় পরিচয় পদবী নয়, পেশাদারিত্ব। আর পেশাদারিত্বের প্রথম ধাপই হলো—মানুষের সঙ্গে দায়িত্বশীল ও সম্মানজনক যোগাযোগ।


No comments:
Post a Comment