নাড়ুদার এক বাক্যের সমাধান
সেদিন বিকেলে নাড়ুদার সঙ্গে চা খেতে খেতে আড্ডা দিচ্ছিলাম। নানা প্রসঙ্গের এক ফাঁকে নাড়ুদা তার অফিসের একটি মজার, কিন্তু শিক্ষণীয় ঘটনা শোনাল।
নাড়ুদার পাশের ডেস্কে নতুন একজন ম্যানেজার যোগ দিয়েছেন। মানুষ হিসেবে খারাপ নন, কাজও মোটামুটি জানেন। কিন্তু তার একটি বিশেষ অভ্যাস ছিল, যা ধীরে ধীরে পুরো অফিসের মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠেছিল।
অভ্যাসটি হলো—সময়-অসময় শিমের ভাজা বিচি খাওয়া।
কেউ কী খাবে, তা নিয়ে নাড়ুদার কোনো আপত্তি নেই। মানুষের খাওয়ার স্বাধীনতা আছে। কিন্তু সমস্যা অন্য জায়গায়।
যারা শিমের ভাজা বিচি খেয়েছেন, তারা জানেন—এটি খাওয়ার সময় "কুটুস কুটুস" শব্দ হয়। আর সেই শব্দ যদি দিনে এক-দুবার হতো, তাহলে সমস্যা ছিল না। কিন্তু নতুন ম্যানেজারের ক্ষেত্রে বিষয়টি ছিল একেবারে অন্যরকম।
সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত সুযোগ পেলেই শুরু হয়ে যেত—
কুটুস...
কুটুস...
কুটুস...
মাঝে মাঝে মনে হতো, অফিসে একজন ম্যানেজার নয়, বরং একটি অত্যন্ত কর্মঠ বিচি-ভক্ষণ যন্ত্র বসে আছে।
অফিসের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত সেই শব্দ পৌঁছে যেত।
বিশেষ করে যারা হিসাব-নিকাশের কাজ করতেন, মনোযোগ দিয়ে রিপোর্ট তৈরি করতেন বা কোনো গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্ট নিয়ে কাজ করতেন, তাদের কাছে বিষয়টি ছিল বেশ বিরক্তিকর।
প্রথম দিকে কেউ কিছু বলেনি।
সবাই ভেবেছিল, নতুন এসেছেন, হয়তো কয়েক দিনের ব্যাপার।
কিন্তু কয়েক দিন পর দেখা গেল, এটি তার দৈনন্দিন রুটিনের অংশ।
সকালে বিচি।
দুপুরে বিচি।
বিকেলে বিচি।
মাঝে মাঝে মনে হতো, অফিসের কাজের চেয়ে বিচির সঙ্গেই তার সম্পর্ক বেশি গভীর।
সহকর্মীরা আকারে-ইঙ্গিতে বিষয়টি বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন।
কেউ মজা করে বলেছে,
—স্যার, আজ বিচির স্টক কেমন?
কেউ আবার বলেছে,
—স্যার, আপনার ডেস্কের পাশে বসলে ক্ষুধা বেড়ে যায়!
কিন্তু কোনো ফল হয়নি।
ম্যানেজারের ভাবখানা ছিল এমন—
"আমার যা ভালো লাগে, আমি তাই করব।"
অথচ কর্পোরেট অফিসে শুধু নিজের সুবিধার কথা ভাবলে চলে না। সেখানে নিজের কাজের পাশাপাশি অন্যের কাজের পরিবেশের প্রতিও দায়িত্ব থাকে।
কয়েক সপ্তাহ পর অফিসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মিটিং হলো।
হেড অফিস থেকে কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এলেন।
মিটিংয়ে নানা বিষয়ে আলোচনা হলো—কাজের মান, সময়ানুবর্তিতা, অফিসের পরিবেশ, আচরণবিধি, পেশাদারিত্ব ইত্যাদি।
নতুন ম্যানেজারও বেশ সুন্দর সুন্দর কথা বললেন।
নীতি, আদর্শ, অফিস ডিসিপ্লিন—সব বিষয়েই তিনি চমৎকার বক্তৃতা দিলেন।
সবাই মনোযোগ দিয়ে শুনল।
এরপর কথা বলার সুযোগ পেল নাড়ুদা।
নাড়ুদা সবসময় সরাসরি কথা বলে। তার কথা অনেকটা বুলেটের মতো—লক্ষ্যে গিয়ে লাগে।
সে বলল,
"আপনারা সবাই খুব সুন্দর কথা বলেছেন। অনেক ভালো পরামর্শও দিয়েছেন। এজন্য সবাইকে ধন্যবাদ।
তবে একটা কথা না বললেই নয়।
আমরা অনেক সময় জেনে বা না জেনে অন্যের বিরক্তির কারণ হয়ে যাই। এটা কখনো কাম্য নয়।
আমরা অনেকেই ডেস্কে বসে নাস্তা করি। নির্দিষ্ট সময়ে সেটা মেনে নেওয়া যায়। যদিও আমাদের ক্যান্টিন আছে।
কিন্তু কেউ যদি সারাদিন ধরে শব্দ করে বাদাম বা শিমের বিচি খেতে থাকে এবং আশপাশের সহকর্মীদের মনোযোগ নষ্ট করে, তাহলে সেটাকে কোনোভাবেই কর্পোরেট কালচার বলা যায় না।"
কথা শেষ হতেই মিটিং রুমে এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এল।
কয়েকজন কর্মকর্তা এক ঝলক তাকালেন সেই ম্যানেজারের দিকে।
অফিসের অন্য কর্মকর্তারাও চুপচাপ তাকিয়ে রইলেন।
আর ম্যানেজার সাহেব?
তিনি হা করে নাড়ুদার কথা শুনছিলেন।
মনে হচ্ছিল, জীবনে প্রথমবার তিনি উপলব্ধি করলেন যে "কুটুস কুটুস" শব্দটিও কখনো অফিসের আলোচ্য বিষয় হতে পারে।
পরে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের একজন বললেন,
"এ ধরনের কোনো আচরণ যদি অফিসের কাজের পরিবেশ নষ্ট করে, তাহলে অবশ্যই আমাদের জানাবেন। আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।"
ঘটনার সবচেয়ে মজার অংশ হলো, সেই মিটিংয়ের পর থেকে বিচিখোর ম্যানেজারের বিচি খাওয়া প্রায় বন্ধ হয়ে গেল।
অন্তত অফিস সময়ের মধ্যে আর সেই কুটুস কুটুস শব্দ শোনা যেত না।
গল্প শেষ করে নাড়ুদা চায়ে চুমুক দিল।
আমি হেসে বললাম,
—তাহলে শেষ পর্যন্ত বিচিরও অবসর হলো?
নাড়ুদা হেসে বলল,
—বিচির দোষ নেই। দোষ হলো জায়গা-সময় না বোঝার।
কথাটা শুনে মনে হলো, এ শুধু শিমের বিচির গল্প নয়।
এটা আসলে কর্মক্ষেত্রে সচেতনতা, ভদ্রতা আর পেশাদারিত্বের গল্প।
ভালো কাজ জানা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শুধু কাজ জানলেই একজন মানুষ ভালো পেশাজীবী হয়ে ওঠে না।
তার সঙ্গে জানতে হয়—
কোথায় কীভাবে আচরণ করতে হয়,
কীভাবে সহকর্মীদের সম্মান করতে হয়,
কীভাবে অন্যের কাজের পরিবেশকে মূল্য দিতে হয়।
কারণ কর্মক্ষেত্রে দক্ষতা মানুষকে চাকরি দেয়, কিন্তু আচরণ মানুষকে সম্মান এনে দেয়।
আর সম্মান হারাতে কখনো কখনো একটি "কুটুস কুটুস" শব্দই যথেষ্ট।


No comments:
Post a Comment