ফিরে দেখা নব্বই দশক: নাড়ুদার হারিয়ে যাওয়া গ্রামের খোঁজে
মানুষ যতই আধুনিক হোক, যতই ব্যস্ত হোক, মনের গভীরে একটি জায়গা সবসময় রয়ে যায়—সেটি তার শেকড়। জীবনের প্রয়োজনে আমরা গ্রাম ছেড়ে শহরে আসি, কর্মব্যস্ততার ঘূর্ণিতে হারিয়ে যাই, কিন্তু সুযোগ পেলেই মন ফিরে যেতে চায় সেই কাঁচা পথ, সবুজ মাঠ, নদীর পাড় আর শৈশবের দিনগুলোর কাছে।
কয়েক দিনের ছুটিতে নাড়ুদা গ্রামের বাড়িতে গিয়েছিল। চাকরির সুবাদে বছরের বেশির ভাগ সময়ই তাকে বাড়ির বাইরে থাকতে হয়। তাই মাঝেমধ্যে গ্রামের বাড়িতে গিয়ে কয়েকটা দিন কাটালে মনটা যেন নতুন করে বাঁচতে শেখে। শহরের জীবন ইট-পাথরের দেয়ালে ঘেরা, কৃত্রিমতায় ভরা। এখানে সম্পর্কের চেয়ে ব্যস্ততা বেশি, আড্ডার চেয়ে প্রয়োজন বেশি, আর মানুষের চেয়ে সময়ের মূল্য বেশি।
সেদিন সকালে নাড়ুদার ফোন এল।
আমি বললাম,
—কেমন আছ দাদা? গ্রামের দিনকাল কেমন কাটছে?
ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর নাড়ুদা ধীর কণ্ঠে বলল,
—আগের মতো নেই রে। গ্রামটা যেন আর সেই গ্রাম নেই।
আমি একটু অবাক হয়ে বললাম,
—কী রকম?
নাড়ুদা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
—ভাবছিলাম গ্রামের বাড়ি এসে নিমোজখানা স্কুল মাঠে বসে জম্পেশ আড্ডা দেব। পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করব। টাটকা মাছ, দেশি মুরগি, ক্ষেতের শাকসবজি খেয়ে শহরের কৃত্রিমতা ভুলে থাকব। কিন্তু এসে দেখি, সেসব যেন এখন গল্পের বইয়ের পাতা।
আমি বললাম,
—একটু বুঝিয়ে বলো।
নাড়ুদা বলতে শুরু করল।
—শহরের কৃত্রিম জীবন যেন গ্রামকেও গ্রাস করতে শুরু করেছে। মানুষগুলো বদলে গেছে। সবাই ব্যস্ত। সবাই দৌড়াচ্ছে। কে কাকে ছাড়িয়ে যাবে, কে বেশি উপার্জন করবে, কে আগে বড় বাড়ি করবে—সেই প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। আগে সন্ধ্যা নামলেই টঙে টঙে আড্ডা বসত, এখন সেখানে নীরবতা। আগে বিনা নিমন্ত্রণে মানুষ মানুষের বাড়িতে যেত, এখন ফোন না করে কেউ কারও দরজায়ও কড়া নাড়ে না।
আমি বললাম,
—সময়ের নিয়মই তো এ রকম দাদা। সবকিছুই বদলায়।
নাড়ুদা বলল,
—বদলাবে, কিন্তু সব বদল কি ভালো?
তার কণ্ঠে যেন চাপা অভিমান।
কিছুক্ষণ পর আবার বলতে লাগল,
—ভাদ্র মাস প্রায় শেষ। অথচ আকাশে বৃষ্টি নেই বললেই চলে। মাঠে আগের মতো জল নেই। জমিতে আর দেশি মাছ দেখা যায় না। মাঝরা, পচানি আর নানা রোগের কারণে ধানখেতে এত কীটনাশক ব্যবহার হচ্ছে যে দেশি জাতের মাছ প্রায় হারিয়ে গেছে। শৈশবের সেই কৈ, মাগুর, শিং, ট্যাংরা এখন গল্পের চরিত্র হয়ে যাচ্ছে।
আমি চুপচাপ শুনছিলাম।
নাড়ুদা আবার বলল,
—আর জানিস, সিদলও আগের মতো পাওয়া যায় না। যে খাবার একসময় আমাদের এলাকার ঐতিহ্য ছিল, সেটাও এখন ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।
কথাগুলো শুনে আমার নিজের শৈশবের স্মৃতিও যেন নাড়া খেতে লাগল।
নাড়ুদা বলতে লাগল,
—সেদিন দেওনাই নদীর পাড়ে গিয়েছিলাম। গিয়ে দেখি, আগের মতো কাশবন নেই। ভাদ্র-আশ্বিন এলেই যে কাশফুলের সাদা সমুদ্র তৈরি হতো, তার অনেকটাই হারিয়ে গেছে। কত মানুষ সেখানে ঘুরতে আসত! নদীর ধারে বসে আড্ডা দিত। বিকেলের বাতাসে কাশফুল দুলত, আর আমরা স্বপ্ন দেখতাম।
কিছুক্ষণ থেমে আবার বলল,
—তখন তো মোবাইল ছিল না। ছিল না রিলস, শর্ট ভিডিও কিংবা সারাদিন ছবি তোলার প্রতিযোগিতা। যাদের সামর্থ্য ছিল, তাদের হাতে দু-একটা ক্যামেরা দেখা যেত। ছবি কম ছিল, কিন্তু স্মৃতি বেশি ছিল। এখন ছবি হাজার হাজার, কিন্তু স্মৃতি যেন কমে যাচ্ছে।
আমি বললাম,
—এটাই তো সময়ের স্রোত দাদা। প্রযুক্তি এগোচ্ছে, পৃথিবী বদলাচ্ছে।
নাড়ুদা মৃদু হেসে বলল,
—হ্যাঁ, প্রযুক্তি এগোচ্ছে। কিন্তু মানুষ কি এগোচ্ছে? মানুষের ভেতরের মানুষটা কি আগের মতো আছে?
প্রশ্নটার উত্তর আমার কাছে ছিল না।
ও আবার বলল,
—নব্বই দশকটাই ছিল আমাদের সোনালি সময়। এখন মাঝে মাঝে মনে হয়, সেই দিনগুলো সত্যিই ছিল, নাকি স্বপ্ন ছিল! সময় পেলেই আমি মনে মনে ফিরে যাই সেই দিনগুলোতে। নিমোজখানা স্কুল মাঠে, দেওনাই নদীর তীরে, কাশবনের ভেতর, ভাদ্র মাসের সবুজ ধানখেতের মাঝে।
তার কণ্ঠে তখন এক অদ্ভুত আবেগ।
মনে হচ্ছিল, সে শুধু একটি গ্রামের কথা বলছে না; সে আসলে হারিয়ে যাওয়া এক সময়ের কথা বলছে।
ফোনের ওপাশে নাড়ুদা কথা শেষ করল।
কিন্তু তার কথাগুলো আমার ভেতরে রয়ে গেল।
আমিও যেন নিমিষেই হারিয়ে গেলাম ফেলে আসা সেই দিনগুলোতে।
নিমোজখানা স্কুল মাঠের প্রাণখোলা আড্ডায়।
শিমুলতলীর ছায়াঘেরা বিকেলে।
দেওনাই নদীর পাড়ের কাশফুলের সমুদ্রে।
আর আমার অজপাড়া গ্রাম নয়ানীর বাগডোকরার ভাদ্র মাসের রাশি রাশি সবুজ ধানক্ষেতের মাঝে।
নীল আকাশের বুকে ভেসে থাকা সাদা ছেঁড়া মেঘের ভেলায়।
হয়তো বাস্তবে সময়ের চাকা উল্টো ঘোরানো যায় না।
কোনো টাইম মেশিন আমাদের শৈশবে ফিরিয়ে নিতে পারে না।
তবু মানুষ বেঁচে থাকে স্মৃতির ভেলায় ভর করে।
আর কিছু কিছু স্মৃতি এমনই—যত পুরোনো হয়, তত বেশি সুন্দর হয়ে ওঠে।
হয়তো সেই কারণেই, ব্যস্ত জীবনের ফাঁকে ফাঁকে আমরা সবাই কখনো না কখনো ফিরে যাই আমাদের হারিয়ে যাওয়া গ্রামের কাছে, শৈশবের কাছে, আর সেই সোনালি সময়ের কাছে—যেখানে এখনো কাশফুল দোলে, নদীর স্রোত বয়ে যায়, আর সন্ধ্যা নামলেই বন্ধুদের আড্ডা জমে ওঠে।
অন্তত আমাদের স্মৃতির ভেতর।



No comments:
Post a Comment