নাড়ুদার লেবুর অঙ্ক - Jamini Kishore Roy

Post Top Ad

নাড়ুদার লেবুর অঙ্ক

Share This

সেদিন নাড়ুদার সঙ্গে বাজারে গিয়েছিলাম। অন্যান্য কেনাকাটা শেষ করে গেলাম লেবু কিনতে। আকারে মাঝারি, দেখতে সাধারণ লেবু—কিন্তু দাম শুনে যেন চোখ কপালে ওঠার উপক্রম।

naruda


—কাকা, লেবুর হালি কত?


দোকানদার কাকা নির্বিকার ভঙ্গিতে বললেন,


—চল্লিশ টাকা।


আমি আর নাড়ুদা দুজনেই একে অপরের মুখের দিকে তাকালাম। কিছুদিন আগেও যে লেবুর হালি পনেরো-বিশ টাকায় পাওয়া যেত, সেটাই এখন চল্লিশ টাকা! আশ্বিন মাস চলছে, সামনে শীতকাল। ফলন কিছুটা কমবে, সেটা স্বাভাবিক। কিন্তু তাই বলে এক লাফে এত দাম?


নাড়ুদা হাসিমুখে দর কষাকষি শুরু করল।


—কাকা, একটু কম করেন।


—না বাপু, এর নিচে পারব না।


অনেকক্ষণ গল্প, অনুরোধ, যুক্তি—সবই চলল। কিন্তু দোকানদার কাকা যেন নিজের অবস্থানে অটল।


শেষ পর্যন্ত তিনি বলেই ফেললেন,


—বাপু, সাড়ে চারশ টাকা দিয়ে পাল্লা কিনে যদি পঞ্চাশ টাকা লাভ করতে না পারি, তাহলে ব্যবসা করে লাভ কী?


আমি তখন জিজ্ঞেস করলাম,


—কাকা, কেজি দরেও লেবু বিক্রি করেন?


—করি তো। একশ টাকা কেজি।


কাকার ধারণা ছিল, আমরা নিশ্চয়ই কেজি হিসেবে কিনব না। কারণ বাজারে অধিকাংশ মানুষই একটা, দুটো কিংবা বড়জোর এক হালি লেবু কিনছে।


ঠিক তখনই নাড়ুদা তার আসল চালটা চালল।


—কাকা, আধা কেজি লেবু দেবেন?


দোকানদার কিছুটা অবাক হলেও মেপে দিলেন।


মাপার পর দেখা গেল, আধা কেজিতে উঠেছে মোট চৌদ্দটি লেবু।


হিসাব করে দেখি, প্রতিটি লেবুর দাম পড়ছে সাড়ে তিন টাকার সামান্য বেশি।


নাড়ুদা সঙ্গে সঙ্গে বলল,


—তুমি সাতটা নাও, আমি সাতটা নিই।


টাকা মিটিয়ে আমরা বাজার থেকে বের হলাম।


হাঁটতে হাঁটতে নাড়ুদা বলল,


—দেখ, বাজারদর বাড়ছে, এটা আমাদের হাতে নেই। কিন্তু কিভাবে কিনব, কিভাবে হিসাব করব, সেটা আমাদের হাতেই আছে।


আমি চুপচাপ শুনছিলাম।


নাড়ুদা আবার বলল,


—অনেক সময় আমরা অভ্যাসের কারণে না ভেবে জিনিস কিনি। কিন্তু একটু হিসাব করলে দেখা যায়, একই জিনিস কম খরচে পাওয়া সম্ভব। সঞ্চয় মানে শুধু বেশি আয় নয়, বুদ্ধি করে খরচ করাও এক ধরনের আয়।


কথাটা আমার খুব মনে ধরল।


সত্যিই তো, বছরে বছরে বাজারদর বাড়ছে। চাল, ডাল, তেল, মাছ, মাংস—সবকিছুর দাম বাড়ছে। কিন্তু অধিকাংশ মানুষের আয় তো সেই অনুপাতে বাড়ে না। ফলে সংসারের ভারসাম্য রক্ষা করতে হলে শুধু পরিশ্রম করলেই হবে না, প্রয়োজন হবে সচেতনতা ও হিসাবি মনোভাবের।


নিম্নবিত্ত কিংবা মধ্যবিত্ত পরিবারের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো পরিকল্পিত ব্যয়। অযথা অপচয় না করে, দাম যাচাই করে, প্রয়োজন অনুযায়ী কিনতে পারলে বছরের শেষে ছোট ছোট সঞ্চয়ই বড় অঙ্কে পরিণত হয়।


সেদিন নাড়ুদা আমাকে শুধু লেবু কেনার কৌশল শেখায়নি; শিখিয়েছিল জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পাঠ—


“টাকা উপার্জন করা যেমন দক্ষতা, টাকা বাঁচানোও তেমনি একটি শিল্প।”


বাজারে সবসময় সবচেয়ে বেশি লাভ করে সে নয়, যে সবচেয়ে বেশি টাকা খরচ করে; বরং সে-ই লাভবান হয়, যে নিজের সামর্থ্যের মধ্যে থেকে বুদ্ধি করে চলতে জানে।


আর তাই আজও যখন বাজারে কোনো জিনিসের অস্বাভাবিক দাম শুনি, তখন নাড়ুদার সেই কথাটাই মনে পড়ে—


“দাম বাড়লে শুধু অভিযোগ করলেই হবে না, একটু হিসাবও করতে হবে।”


No comments:

Post a Comment

Post Bottom Ad

Pages