সেদিন শিমুলতলীতে দেওনাই নদীর পাড়ে বসে নাড়ুদার সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিলাম।
আশ্বিন মাসের কেবল শুরু। পড়ন্ত বিকেলের সোনালি আলো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। সামনে যতদূর চোখ যায়, শুধু সবুজ আর সবুজ। ধানের ক্ষেত, পটলের ক্ষেত, বাঁশঝাড়। নদীর ওপারে কৃষকের আখক্ষেত বাতাসে দুলছে। নদীতীরে সাদা কাশফুলগুলো শরতের আগমনী বার্তা নিয়ে মাথা নেড়ে চলেছে।
দেওনাই নদীর স্বচ্ছ জল শান্ত স্বভাবে ভাটির দিকে বয়ে যাচ্ছে। শিমুলতলী স্কুল মাঠে ছেলেরা ফুটবল খেলছে। বটগাছের ছায়ায় কয়েকজন প্রবীণ মানুষ গল্পে মশগুল। ছোট ছোট শিশুরা ছুটে বেড়াচ্ছে এদিক-সেদিক। নদীর ঘাটে একটি ছোট নৌকা মাঝেমধ্যে দু-একজন যাত্রীকে পারাপার করছে। কিছু গরু-ছাগল নদীতীরের ঘাস খেতে ব্যস্ত।
সব মিলিয়ে দৃশ্যটা এতটাই সুন্দর ছিল যে মনে হচ্ছিল, প্রকৃতি যেন নিজের হাতে একটি জীবন্ত ছবি এঁকেছে।
এ জায়গাটার সঙ্গে আমার শৈশব জড়িয়ে আছে। কত বিকেল, কত আড্ডা, কত স্বপ্ন, কত গল্প এই নদীর পাড়ে রেখে গেছি! কিন্তু সময়ের স্রোতে সবসময় তো আর ফিরে আসা হয় না সেই চেনা জায়গাগুলোতে।
নাড়ুদা নদীর জলের দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে বলল,
—জানিস, দিন দিন সব কিছু যেন হারিয়ে যাচ্ছে। শুধু জায়গা নয়, মানুষও হারিয়ে যাচ্ছে। পরিচিত মুখগুলো একে একে দূরে সরে যাচ্ছে।
আমি হেসে বললাম,
—এটাই হয়তো পৃথিবীর নিয়ম দাদা। সময় কাউকে ধরে রাখে না।
নাড়ুদা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
—আগামী দুই-তিন দশকের মধ্যে একটি প্রজন্ম এই পৃথিবী থেকে প্রায় হারিয়ে যাবে। এমন একটি প্রজন্ম, যাদের মতো মানুষ আর হয়তো কখনও জন্মাবে না।
আমি কৌতূহলী হয়ে তার দিকে তাকালাম।
নাড়ুদা বলতে লাগল,
—যারা রাত হলে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ে, ভোরে উঠে যায়। যারা ঘুম থেকে উঠে উঠানে ঝাড়ু দেয়, গাছে জল দেয়। যারা পূজার জন্য ফুল তোলে, ছবিতে প্রণাম করে, মন্দিরে যায়। যারা পথে দেখা হলে থেমে খোঁজখবর নেয়, দুই হাত জোড় করে নমস্কার করে।
যারা রেডিও শুনত, যাত্রাপালা দেখত, গ্রাম্য নাটকের জন্য অপেক্ষা করত।
যারা ফোন নম্বর মুখস্থ রাখত, ডায়েরিতে লিখে রাখত। যারা খবরের কাগজের প্রতিটি লাইন মন দিয়ে পড়ত, এমনকি বিজ্ঞাপনও।
যারা পুরোনো জিনিস সহজে ফেলে দিত না। পুরোনো চপ্পল আরামদায়ক বলে পরত, পুরোনো গেঞ্জি নরম বলে ভালোবাসত, পুরোনো চশমা দিয়েই পৃথিবী দেখত।
যারা অল্পতেই খুশি হতো।
যারা কম পেত, কিন্তু বেশি কৃতজ্ঞ থাকত।
যারা ঈশ্বরে বিশ্বাস রাখত, মানুষকে সম্মান করত, সমাজকে ভয় করত, অন্যের কষ্টে কষ্ট পেত।
নাড়ুদার কণ্ঠে তখন অদ্ভুত এক আবেগ।
—তুই কি জানিস, এই মানুষগুলো আস্তে আস্তে নিঃশব্দে আমাদের ছেড়ে চলে যাচ্ছে?
আমি কিছু বললাম না।
সে আবার বলল,
—তোর বাড়িতে যদি এমন কেউ থাকে, তবে তাদের সময় দে। তাদের কথা শোন। তাদের পাশে বস। তাদের গল্প শুনে বিরক্ত হবি না।
কারণ তাদের সঙ্গে শুধু একজন মানুষ চলে যাবে না, চলে যাবে একটি যুগ।
চলে যাবে সন্তুষ্ট থাকতে জানার শিক্ষা।
চলে যাবে অল্পতে সুখ খুঁজে পাওয়ার শিক্ষা।
চলে যাবে মানুষকে সম্মান করার শিক্ষা।
চলে যাবে সম্পর্ককে টাকার চেয়ে বড় ভাবার শিক্ষা।
চলে যাবে সেই সরল জীবন, যেখানে সুখের জন্য খুব বেশি কিছুর প্রয়োজন হতো না।
আমি নদীর দিকে তাকিয়ে রইলাম।
সত্যিই তো!
এই প্রজন্মের মানুষগুলো এমন এক সময়ের প্রতিনিধি, যখন মানুষের ঘরে হয়তো অনেক কম জিনিস ছিল, কিন্তু মন ছিল অনেক বেশি ভরা।
আজ ঘরে টেলিভিশন আছে, স্মার্টফোন আছে, ইন্টারনেট আছে, শত শত চ্যানেল আছে—কিন্তু সেই দীর্ঘ আড্ডা নেই।
বন্ধুর বাড়িতে হুট করে চলে যাওয়ার অভ্যাস নেই।
আত্মীয়তার সেই উষ্ণতা নেই।
সময় আছে সবার হাতে, কিন্তু একে অপরের জন্য সময় নেই।
নাড়ুদা বলল,
—মানব ইতিহাসে এটাই হয়তো শেষ প্রজন্ম, যারা তাদের বড়দের কথা শুনে বড় হয়েছে, আর এখন ছোটদের কথা শুনে বার্ধক্য কাটাচ্ছে।
কথাটা শুনে আমার বুকের ভেতর কেমন যেন হাহাকার করে উঠল।
দেওনাই নদীর জলে তখন শেষ বিকেলের আলো ঝিকমিক করছে। কাশফুলের সাদা ঢেউ বাতাসে দুলছে। স্কুল মাঠের ছেলেদের খেলা প্রায় শেষ।
আমি হঠাৎ অনুভব করলাম, শুধু সূর্যই অস্ত যাচ্ছে না।
একটি সময়ও অস্ত যাচ্ছে।
একটি সংস্কৃতি অস্ত যাচ্ছে।
একটি জীবনদর্শন অস্ত যাচ্ছে।
হয়তো একদিন এই পৃথিবীতে অনেক উন্নত প্রযুক্তি থাকবে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থাকবে, উড়ন্ত গাড়ি থাকবে, আরও অনেক কিছু থাকবে।
কিন্তু তখন আর থাকবে না সেই মানুষগুলো, যারা দুপুরবেলা উঠানের আমগাছের নিচে বসে গল্প করত।
থাকবে না সেই মানুষগুলো, যারা অতিথি এলে নিজের অংশের মাছটুকুও তার প্লেটে তুলে দিত।
থাকবে না সেই মানুষগুলো, যারা নিজের কষ্ট লুকিয়ে রেখে অন্যের সুখে হাসতে পারত।
সেদিন হয়তো আমরা বুঝতেই পারব না, কী হারিয়েছি।
কিন্তু পৃথিবী বুঝবে।
বাতাস বুঝবে।
গ্রামের পথ বুঝবে।
নদীর ঘাট বুঝবে।
আর হয়তো কোনো এক শরতের বিকেলে, কাশফুলের সাদা সমুদ্রের পাশে দাঁড়িয়ে আমাদেরও মনে হবে—
আমরা শুধু কিছু মানুষ হারাইনি।
আমরা হারিয়েছি একটি সুন্দর পৃথিবী।
“সময়ের সঙ্গে মানুষ বদলায়, সমাজ বদলায়, প্রযুক্তি বদলায়। কিন্তু কিছু মূল্যবোধ আছে, যা হারিয়ে গেলে আর ফিরে আসে না। সেই মূল্যবোধগুলোই আজও বেঁচে আছে আমাদের প্রবীণদের চোখে, তাদের গল্পে, তাদের সরল জীবনযাপনে।”

No comments:
Post a Comment