ফিরে দেখা ফেলে আসা দিন - Jamini Kishore Roy

Post Top Ad

ফিরে দেখা ফেলে আসা দিন

Share This

অনেক দিন পর নাড়ুদার সঙ্গে দেখা। বিকেলের দিকে দুজনে হাঁটতে হাঁটতে বাড়ির পশ্চিম পাশের ছোট নদীটার ব্রিজের কাছে গিয়ে বসলাম। নদী বললেও অনেকে একে খাল বলে। আমাদের এলাকায় এর নাম কুচিয়ামোড় ডাড়া।

naruda


ছোটবেলায় নিমোজখানা হাটে যেতে হলে এই নদীটাই ছিল সবচেয়ে বড় বাধা। বাড়ি থেকে হাটের দূরত্ব দেড় কিলোমিটারের বেশি নয়, কিন্তু নদীর কারণে তিন-চার কিলোমিটার ঘুরে যেতে হতো। শর্টকাট বলতে ছিল আইলের পথ। বর্ষার সময় সেই পথও অনেকটা অনিশ্চিত হয়ে যেত।


আমার ঠাকুরদাদা প্রতি বছর একটি সুপারি গাছ কেটে নদীর ওপর ফেলে দিতেন। তার ওপর বাঁশ বেঁধে তৈরি হতো অস্থায়ী সাঁকো। গ্রামের মানুষ সাবধানে ধরে ধরে পার হতো। পরে পাড়ার ছেলেরা মিলে আইলটা আরও বড় করল, সাঁকোটাও একটু মজবুত হলো। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই আইল একদিন ছোট রাস্তা হয়ে গেল। তারপর সরকারি বাজেটে নির্মিত হলো একটি ব্রিজ।


সবচেয়ে আনন্দের বিষয়, ব্রিজটির নামকরণ হয়েছিল আমার প্রয়াত ঠাকুরদাদার নামে।


আমাদের বাড়িটা যেন প্রকৃতির এক আশ্চর্য আশীর্বাদে ঘেরা। পূর্ব পাশে বয়ে চলেছে দেওনাই নদী, পশ্চিম পাশে কুচিয়ামোড়। দক্ষিণে গিয়ে দুটি নদী মিলেছে একসঙ্গে। উত্তরে গিয়ে কুচিয়ামোড় আবার দুই ভাগ হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে দূরের বিল আর জনপদের দিকে। মাঝে মাঝে সত্যিই মনে হয়, আমাদের এই ছোট্ট পাড়াটা যেন চারদিক জলঘেরা এক দ্বীপ।


ব্রিজের ওপর বসে চারপাশের দৃশ্য দেখছিলাম। কয়েক মাস আগে ব্রিজের উজানে একটি সুইস গেট নির্মাণ হয়েছে। দুই দশকের ব্যবধানে পুরো এলাকার চেহারাই বদলে গেছে।


নাড়ুদা হঠাৎ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,


—দেখিস, সময় কত দ্রুত বদলে যায়! আমরা যখন ছোট ছিলাম আর এখন—দুই পৃথিবীর মধ্যে যেন আকাশ-পাতাল তফাৎ।


আমি চুপচাপ শুনছিলাম।


নাড়ুদা আবার বলল,


—শহরের ব্যস্ততা এখন গ্রামকেও গ্রাস করে ফেলেছে। আগে একজন মানুষ গ্রামের বাড়িতে এলে দশজন এসে খোঁজ নিত। কবে এলি, কবে যাবি, কোথায় থাকিস, কী করিস, বাড়ির সবাই কেমন আছে—এসব জানতে চাইত। এখন দেখ, কত মানুষ আমাদের সামনে দিয়ে যাচ্ছে। কেউ কেউ হাই-হ্যালো করছে ঠিকই, কিন্তু দু'মিনিট দাঁড়িয়ে গল্প করার সময় কারও নেই।


আমি চারদিকে তাকালাম।


সত্যিই তো!


মানুষ আছে, ভিড় আছে, চলাফেরা আছে—কিন্তু কোথাও যেন সেই প্রাণখোলা আড্ডা নেই।


এখন সম্পর্ক আছে, কিন্তু সময় নেই।


খোঁজখবর আছে, কিন্তু আন্তরিকতা কমে গেছে।


আড্ডা আছে, কিন্তু বেশির ভাগই মোবাইলের পর্দায়।


নাড়ুদা হাসতে হাসতে বলল,


—এখন আর আগের মতো গল্প হয় না রে। এখন শুধু ফরম্যালিটিস মেইনটেইন হয়।


কথাটা শুনে বুকের ভেতর কেমন যেন লাগল।


ভাবলাম, শুধু অন্যরা নয়, আমরাও তো বদলে গেছি। সময়ের স্রোতে ভেসে যেতে যেতে অনেক কিছুই পিছনে ফেলে এসেছি। চাইলে আর আগের জায়গায় ফিরে যাওয়া যায় না।


এদিকে আশ্বিনের বিকেল ধীরে ধীরে গোধূলির দিকে ঝুঁকছে।


চারদিকে শুধু সবুজ আর সবুজ।


ধানক্ষেতের ঢেউ বাতাসে দুলছে।


উপরে নীল আকাশে সাদা তুলোর মতো মেঘ ভাসছে।


দূরে উত্তরের দিকে হিমালয়ের শুভ্র চূড়াগুলো মেঘের সঙ্গে মিশে গেছে বলে মনে হচ্ছে।


প্রকৃতি যেন আজও আগের মতোই আছে, কিন্তু মানুষ বদলে গেছে।


আমি আর নাড়ুদা ধীরে ধীরে নিমোজখানা হাটের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম।


হয়তো অনেক পরিচিত মানুষের সঙ্গে দেখা হবে।


হয়তো অনেকের সঙ্গেই আর দেখা হবে না।


হয়তো আড্ডাও হবে না আগের মতো।


শুধু কয়েকটা সৌজন্যমূলক কথা, একটুখানি হাসি, তারপর আবার যে যার পথে।


নাড়ুদার ভাষায়—


এখন আর সম্পর্কের গভীরতা মাপা হয় না, এখন শুধু ফরম্যালিটিস মেইনটেইন করা হয়।


তবু সেই পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছিল, কোথাও না কোথাও এখনও লুকিয়ে আছে আমাদের শৈশব, আমাদের আড্ডা, আমাদের হারিয়ে যাওয়া দিনগুলো।


হয়তো তারা আর ফিরে আসবে না।


কিন্তু স্মৃতির দেওনাই নদীর পাড়ে, কুচিয়ামোড়ের ব্রিজে, আশ্বিনের সাদা মেঘের নিচে তারা আজও নীরবে বেঁচে আছে।


No comments:

Post a Comment

Post Bottom Ad

Pages