যে ভোর আর ফিরে আসে না - Jamini Kishore Roy

Post Top Ad

যে ভোর আর ফিরে আসে না

Share This

আশ্বিনের ভোর। শরতের স্নিগ্ধ বাতাসে ভেসে আসছে শেফালী ফুলের মিষ্টি সুবাস। ঘাসের বুকে জমে থাকা শিশিরবিন্দু যেন প্রকৃতির হাতে গড়া অমূল্য মুক্তোর মালা। কিছুদিন আগের তীব্র গরম অনেকটাই কমে এসেছে। এমন ভোরে বিছানা ছেড়ে উঠতে মন চায় না; মনে হয়, পৃথিবীর সমস্ত শান্তি যেন এই শেষ রাতের ঘুমের মধ্যেই লুকিয়ে আছে।

aruda


ঠিক তখনই ঘুমের ঘোরে শুনতে পেলাম কেউ যেন ডাকছে—


“যামিনী, ওঠো! তাড়াতাড়ি চল!”


গলার স্বর শুনেই চিনে ফেললাম—এ যে নাড়ুদা!


চমকে উঠে বললাম, “কোথায় যাব, নাড়ুদা?”


নাড়ুদা হেসে বলল, “কেন, মনে নেই? মাছ ধরতে হবে। এখন না গেলে লেটাইতে মাছ পাওয়া যাবে না।”


কথাটা শুনেই যেন শরীরের সমস্ত আলস্য উধাও হয়ে গেল।


আমাদের গ্রামের মানুষের কাছে ‘লেটাই’ শুধু মাছ ধরার একটি কৌশল নয়, বরং এক টুকরো শৈশব, এক টুকরো উৎসব। ধানক্ষেতের আইলের পাশে ছোট্ট নালা তৈরি করে, এক প্রান্তে গামলা বা বালতি দিয়ে জল সেচে কৃত্রিম স্রোত সৃষ্টি করা হতো। সেই স্রোতের টানে ধানক্ষেতের ভেতর থেকে পুটি, দারকিনি, চাঁদা, চোপড়া আর নানা রকম ছোট মাছ ভেসে এসে জাল বা বাঁশের তৈরি ‘হেঙ্গা’-য় জমা হতো।


ভাদ্রের শেষ আর আশ্বিনের শুরুতে আমাদের গ্রামে ভোরবেলার সবচেয়ে বড় আনন্দ ছিল এই লেটাই।


আজকের মতো তখন জমিতে এত কীটনাশক ব্যবহার হতো না। তাই ধানক্ষেত মানেই ছিল জীবনের এক বিশাল ভাণ্ডার। এখন সেই পুটি, দারকিনি কিংবা চাঁদা মাছ যেন স্মৃতির পাতাতেই বেশি দেখা যায়।


নাড়ুদার ডাকে ছুটলাম কুচিয়ামোড় ডাড়ার দিকে। ক্ষেতের মাঝখানে ছোট্ট একটি পুকুর। তার পাশেই আমাদের লেটাই করা। নাড়ুদাকে সঙ্গে নিয়ে মাছ ধরা শুরু করলাম। আশেপাশে আরও অনেকে এসেছে। সবাই জানে, ভোরের আলো ফোটার আগেই মাছ সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায়।


ধীরে ধীরে পূর্ব আকাশে আলো ফুটতে শুরু করল।


রাতজাগা পাখিরা দূরে উড়ে যাচ্ছে। দোয়েল আর ফিঙে সকালের আগমনী বার্তা শুনিয়ে দিচ্ছে। দূর থেকে ভেসে আসছে মোরগের ডাক। রাতের তারাগুলো দিনের আলোয় মিলিয়ে যাচ্ছে। পূর্ব দিগন্তে লালচে আভা ছড়িয়ে পড়ছে। হালকা কুয়াশা ধানক্ষেত আর গাছপালাকে আবছা করে রেখেছে। উত্তরের দিকে হিমালয়ের চূড়াগুলোকে দূর থেকে মেঘের মতো মনে হচ্ছে।


চারপাশের জনপদ ধীরে ধীরে জেগে উঠছে।


এরই মধ্যে আমাদের বালতি ভরে গেছে টাটকা পুটি, দারকিনি, চাঁদা আর চোপড়া মাছে। আনন্দে মন ভরে গেল। আমি আর নাড়ুদা মাছভর্তি বালতি নিয়ে বাড়ির দিকে রওনা দিলাম।

naruda


বাড়িতে এসে মাছ ভাগ করে নাড়ুদা চলে গেল।


মা তখন রান্নাঘরে ভাত বসিয়েছেন। আমি হাত-মুখ ধুয়ে বসে আছি কখন খেতে ডাকবে। মনে মনে ভাবছি, আজ টাটকা মাছ দিয়ে কী যে মজার ভাত হবে!


মা ডাকলেন—


“যামিনী, খেতে বসো।”


আমি খেতে বসতে যাব, এমন সময়—


হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল।


নিমিষের মধ্যেই সবকিছু বদলে গেল।


নাড়ুদা নেই। কুচিয়ামোড় ডাড়া নেই। লেটাই নেই। মাছভর্তি বালতিও নেই।


আমি আবিষ্কার করলাম, আমি আমার গ্রাম থেকে বহু দূরে, আমার শৈশব থেকে আরও বহু দূরে দাঁড়িয়ে আছি।


এক মুহূর্তেই বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে উঠল।


স্বপ্নটা যদি সত্যি হতো! যদি আরেকবার নাড়ুদার সঙ্গে ভোরবেলা লেটাইতে মাছ ধরতে যেতে পারতাম! যদি আরেকবার সেই শিশিরভেজা ধানক্ষেত, সেই পাখির ডাক, সেই টাটকা মাছের স্বাদ ফিরে পেতাম!


কিন্তু সময় কখনও পিছিয়ে যায় না।


শৈশবও ফিরে আসে না।


শুধু মাঝেমধ্যে কোনো আশ্বিনের ভোরে, কোনো শেফালির সুবাসে, কোনো অচেনা পাখির ডাকে স্মৃতিগুলো নীরবে ফিরে আসে। হৃদয়ের দরজায় আস্তে করে কড়া নাড়ে। তারপর আবার হারিয়ে যায়।


আর আমরা দূর থেকে দাঁড়িয়ে দেখি—


একটি ভোর, একটি লেটাই, আর নাড়ুদা নামের একজন মানুষ ধীরে ধীরে স্মৃতির কুয়াশার মধ্যে মিলিয়ে যাচ্ছে।


তবুও তারা হারিয়ে যায় না।


গোপনে গোপনে তারা বেঁচে থাকে হৃদয়ের গভীরে, যেখানে সময়ের কোনো ক্ষমতা নেই।


No comments:

Post a Comment

Post Bottom Ad

Pages