নাড়ুদার মহালয়া এবং আপনভোলা জীবন - Jamini Kishore Roy

Post Top Ad

নাড়ুদার মহালয়া এবং আপনভোলা জীবন

Share This

সেদিন হঠাৎ নাড়ুদার ফোন।


ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে প্রশ্ন এল,

naruda


— যামিনী, এবার মহালয়া কবে যেন?


প্রশ্নটা শুনে একটু থমকে গেলাম। মহালয়া কবে, সেটা আমারও ঠিক মনে নেই। তবু নাড়ুদার সামনে নিজের অজ্ঞতা প্রকাশ করতে মন চাইল না। তাই খানিকটা আন্দাজে বলেই ফেললাম,


— পরশু দিন মনে হয় হয়ে গেছে, দাদা!


আমার কথা শুনে নাড়ুদা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,


— আচ্ছা, লোককেই তো জিজ্ঞাসা করলাম! যাকে জিজ্ঞাসা করলাম, সেও আবার আপনভোলা!


কথাটা শুনে হাসি চেপে রাখতে পারলাম না। দাদাকে বললাম,


— কী আর করব, দাদা! একেই বোধহয় বলে দৌড়ের ওপর থাকা!


কথাটা হাসতে হাসতে বললেও এর মধ্যে যে জীবনের একটা বড় সত্য লুকিয়ে আছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।


আমাদের মতো প্রাইভেট চাকরিজীবীদের জীবনটাই এমন। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজের পেছনে ছুটতে ছুটতে কখন যে দিন, সপ্তাহ, মাস পেরিয়ে যায়, তা টের পাওয়ারও সময় থাকে না। অফিসের হিসাব মেলাতে গিয়ে নিজের জীবনের হিসাবটাই কখন যেন গুলিয়ে যায়!


মাসের কোন তারিখে বেতন হবে, কোন তারিখে বিল জমা দিতে হবে, কখন অডিট, কখন মিটিং, কখন রিপোর্ট জমা দেওয়ার শেষ দিন—এসব কিন্তু দিব্যি মনে থাকে। কারণ, এসব ভুলে গেলে বিপদ আছে। কিন্তু এরই ফাঁকে কখন শরৎ এসে যায়, কখন আকাশে সাদা মেঘের ভেলা ভেসে বেড়ায়, কখন শিউলি ফুলের গন্ধে চারদিক ম-ম করে ওঠে, আর কখন মহালয়া এসে দুর্গাপুজোর আগমনী বার্তা দিয়ে যায়—তার খোঁজ রাখার সময় কোথায়!


একসময় মহালয়া মানেই ছিল অন্য রকম একটা অনুভূতি। ভোরের অন্ধকারে রেডিওতে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠে চণ্ডীপাঠ, ঘুমজড়ানো চোখে নতুন দিনের সূচনা, চারদিকে শিউলি ফুলের সুবাস আর মনে পুজো আসার অদ্ভুত উত্তেজনা। মহালয়া এলেই মনে হতো, আমাদের চারপাশের পৃথিবীটা যেন একটু বেশি সুন্দর হয়ে উঠেছে।

naruda


আর এখন?


কখন মহালয়া এল, কখন চলে গেল, অনেক সময় ক্যালেন্ডার না দেখলে মনেই পড়ে না। পুজোর আনন্দের জায়গাটা দখল করে নিয়েছে অফিসের কাজ, মাসের হিসাব আর আগামী দিনের চিন্তা।


তবে দোষটা কি শুধু চাকরির?


হয়তো সংসারের দায়িত্ব আছে, ভবিষ্যতের চিন্তা আছে, জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার তাগিদ আছে। সবাই তো আর ইচ্ছেমতো কাজ ফেলে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে পারে না। জীবন চালাতে গেলে উপার্জন করতে হয়, দায়িত্ব পালন করতে হয়, অনেক কিছু সামলে চলতে হয়।


কিন্তু সমস্যা হলো, এই সামলাতে সামলাতে আমরা কখন যেন জীবনের ছোট ছোট আনন্দগুলোকে পাশ কাটিয়ে যাই। যে উৎসব একসময় আমাদের মন ভালো করে দিত, আজ তার তারিখটাই মনে থাকে না। যে শরতের আকাশ দেখে একসময় মন আনন্দে ভরে উঠত, আজ সেই আকাশের দিকে তাকানোর ফুরসতটুকুও হয় না।


নাড়ুদার ফোনটা তাই আমাকে একটু অন্যভাবে ভাবতে বাধ্য করল।


মনে হলো, আমরা দুজনেই যেন একই রোগে আক্রান্ত—আপনভোলা রোগ! তবে আমাদের আপনভোলা হওয়ার কারণ আলাদা। নাড়ুদা হয়তো নিজের মতো করেই জীবন কাটায়, আর আমি অফিসের কাজের ভিড়ে বাইরের পৃথিবীটাকেই ভুলতে বসেছি।


তফাত শুধু এটুকুই, নাড়ুদা মহালয়ার তারিখ জানতে ফোন করেছে, আর আমি মহালয়ার তারিখ না জেনেও বেশ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে উত্তর দিয়ে বসেছি!


এবার ভাবুন, আমাদের অবস্থা কতটা করুণ!


একজন জানতে চাইছে, আরেকজন না জেনেই জানিয়ে দিচ্ছে। দুজনের কেউই নিশ্চিত নয়, অথচ কথোপকথন চলছে দিব্যি!


এই হলো আমাদের আপনভোলা জীবনের নমুনা!


তবে হাসির আড়ালে একটা আক্ষেপও থেকে যায়। জীবনের ব্যস্ততা আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? আমরা কি শুধু কাজ করে যাব, উপার্জন করে যাব, দায়িত্ব পালন করে যাব? নাকি মাঝে মাঝে একটু থেমে নিজেদের চারপাশটাকেও দেখব?


জীবন তো শুধু অফিসের ফাইল, হিসাবের খাতা আর মাস শেষে বেতনের অঙ্ক নয়। জীবনের বাইরেও একটা সুন্দর পৃথিবী আছে। সেখানে শরৎ আসে, শিউলি ফোটে, পুজোর আগমনী বাজে, পুরোনো বন্ধুরা ফোন করে, আর নাড়ুদার মতো মানুষ হঠাৎ একদিন জিজ্ঞাসা করে বসে—


— যামিনী, এবার মহালয়া কবে যেন?


এই সামান্য প্রশ্নের মধ্যেও কতখানি আন্তরিকতা, কতখানি পুরোনো দিনের টান লুকিয়ে থাকে!


তাই ভাবছি, এবার থেকে অন্তত মাঝে মাঝে কাজের ফাইল বন্ধ করে একটু আকাশের দিকে তাকাব। ক্যালেন্ডারের পাতায় শুধু বেতন আর বিল জমা দেওয়ার তারিখ নয়, জীবনের আনন্দের দিনগুলোকেও খুঁজে নেব।


আর নাড়ুদা যদি আবার ফোন করে কোনো কিছু জানতে চায়, তাহলে উত্তর দেওয়ার আগে একটু যাচাই করে নেব। কারণ, দৌড়ের ওপর থাকলেও সব সময় দৌড়ে উত্তর দেওয়া ঠিক নয়!


শেষ পর্যন্ত নাড়ুদার কাছে আমার একটা প্রশ্ন থেকেই গেল—


দাদা, মহালয়ার তারিখটা তো ভুলে গেছি, কিন্তু বলো তো, আমরা যে জীবনের আনন্দগুলো ভুলে যাচ্ছি, সেগুলো আবার কবে ফিরে পাব?


নাড়ুদা হয়তো এরও একটা মজার উত্তর দেবে। আর আমি হয়তো সেই উত্তর শুনে আবার হাসব।


কিন্তু মনের ভেতরে কোথাও একটা কথা ঠিকই থেকে যাবে—


জীবনের দৌড়ে সফল হওয়া জরুরি, কিন্তু দৌড়াতে দৌড়াতে জীবনটাকেই ভুলে যাওয়া বোধহয় সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা!


No comments:

Post a Comment

Post Bottom Ad

Pages