নাড়ুদার স্বর্গ-নরকের হিসাব - Jamini Kishore Roy

Post Top Ad

নাড়ুদার স্বর্গ-নরকের হিসাব

Share This

নাড়ুদার সঙ্গে নিমোজখানার বিজয়া দশমীর মেলায় ঘুরে বেড়াচ্ছি। মেলার ভিড়, দোকানপাট, মানুষের কোলাহল—সব মিলিয়ে বেশ জমজমাট পরিবেশ। ঘুরতে ঘুরতে একটা জায়গায় দাঁড়িয়েছি, এমন সময় পিছন থেকে এক ভিক্ষুক নাড়ুদাকে উদ্দেশ করে বলল,


— দাদা, দশটা টাকা ভিক্ষা দেন না!


নাড়ুদা পিছন ফিরে লোকটাকে একবার ভালো করে দেখল। মাঝবয়সী মানুষ, চেহারায় তেমন অসুস্থতার ছাপ নেই। হাত-পা বেশ সবল, দেখলেই বোঝা যায়, পরিশ্রম করে খাওয়ার মতো শারীরিক ক্ষমতা আছে। এমন একজন মানুষ ভিক্ষা করছে দেখে নাড়ুদার মুখটা একটু গম্ভীর হয়ে গেল।


নাড়ুদা বলল,


— যান, ভিক্ষা দিতে পারব না।


কিন্তু লোকটা নাছোড়বান্দা। সে আবার অনুনয় করে বলল,


— দেন না দাদা, মাত্র দশটা টাকা! ভগবান আপনাকে স্বর্গে খুব ভালো জায়গা দেবেন।


এবার নাড়ুদা যেন একটা মোক্ষম যুক্তি খুঁজে পেল। গম্ভীর মুখে বলল,


— আপনাকে ভিক্ষা দিলে আমি স্বর্গে ভালো জায়গা পাব, তাই তো?


— হ্যাঁ দাদা, ভগবান আপনার মঙ্গল করবেন।


নাড়ুদা এবার একটু ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করল,


— আচ্ছা, আমি যদি আপনাকে দশটা টাকা দিয়ে স্বর্গে ভালো জায়গা পাই, তাহলে আপনি কোথায় থাকবেন?


লোকটা একটু থমকাল। তারপর বলল,


— আমিও স্বর্গে যাব, দাদা!


এ কথা শুনে নাড়ুদা এমনভাবে তাকাল, যেন লোকটা স্বর্গের জমি আগাম বুকিং দিয়ে বসে আছে!


— কী বললেন? আপনিও স্বর্গে যাবেন? তাহলে তো মুশকিল! আমি আপনাকে দশ টাকা দিয়ে স্বর্গে ভালো জায়গা পাব, আর সেখানে গিয়েও যদি আপনার সঙ্গে দেখা হয়ে যায়, তখন আবার আমার কাছে ভিক্ষা চাইবেন! না না, সে হবে না। আপনাকে ভিক্ষা দেওয়া যাবে না। যান, অন্য কোথাও চেষ্টা করুন!


লোকটা এবার বুঝল, স্বর্গের রাস্তা দিয়ে সুবিধা হচ্ছে না। তাই তাড়াতাড়ি কৌশল বদলে বলল,


— না না দাদা, আমি স্বর্গে যাব না। আমি নরকে যাব!


এবার নাড়ুদা যেন আরও বিপদে পড়ে গেল। মাথা নেড়ে বলল,


— সে কী কথা! আমি আপনাকে দশ টাকা ভিক্ষা দিয়ে স্বর্গে যাব, আর আপনাকে নরকে পাঠিয়ে দেব? তা কী করে হয়? আমি কি এমন নিষ্ঠুর মানুষ নাকি? একজনকে স্বর্গে যাওয়ার টিকিট কাটতে সাহায্য করব, আর আরেকজনকে নরকে পাঠিয়ে নিশ্চিন্তে স্বর্গে বসে থাকব—এ আমার দ্বারা হবে না!


তারপর হাত নেড়ে বলল,


— না মশাই, আপনাকে ভিক্ষা দিয়ে আপনাকে নরকে পাঠানোর পাপ আমি করতে পারব না। তার চেয়ে আপনি যান, আমিও আমার পথে যাই। স্বর্গ-নরকের হিসাবটা আগে মিটুক, তারপর দেখা যাবে!


ভিক্ষুক লোকটা কিছুক্ষণ নাড়ুদার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর কী ভেবে সেখান থেকে চলে গেল।


আমি তো ততক্ষণে হতভম্ব! দশটা টাকা চেয়ে লোকটা কোথায় গিয়ে পৌঁছাল, আর নাড়ুদা তাকে স্বর্গ-নরক ঘুরিয়ে কোথায় নামিয়ে দিল!


আমি নাড়ুদাকে বললাম,


— দাদা, তোমার মাথায় এত যুক্তি আসে কী করে? একটা দশ টাকার ভিক্ষা নিয়ে তুমি তো রীতিমতো পরকাল পর্যন্ত হিসাব কষে ফেললে!


নাড়ুদা মুচকি হেসে বলল,


— শোন, জীবনে সব সমস্যার সমাধান টাকা দিয়ে হয় না। কখনো কখনো একটু যুক্তি খাটাতে হয়! তবে লোকটা যদি আবার ফিরে আসে, তখন কিন্তু আমাকে আর স্বর্গ-নরকের হিসাব করতে বলিস না!


এই বলে নাড়ুদা আবার মেলার ভিড়ের মধ্যে হাঁটতে শুরু করল। আর আমি মনে মনে ভাবলাম, নাড়ুদার সঙ্গে মেলায় ঘুরতে বেরোলে মেলার আনন্দ তো পাওয়া যায়ই, সঙ্গে বিনা টিকিটে স্বর্গ-নরক দর্শনও হয়ে যায়!


No comments:

Post a Comment

Post Bottom Ad

Pages