ক্ষমতার দাপট আর লেবুর খোসার চা - Jamini Kishore Roy

Post Top Ad

ক্ষমতার দাপট আর লেবুর খোসার চা

Share This

পোশাক শিল্পে যারা কাজ করেন, তারা প্রায় সবাই "বায়িং কিউসি" শব্দটির সঙ্গে পরিচিত। তাদের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্দিষ্ট বায়ারের প্রতিনিধি হিসেবে তারা বিভিন্ন কারখানায় গিয়ে পণ্যের মান পরীক্ষা করেন। তাদের অনুমোদন ছাড়া অনেক সময় কোনো শিপমেন্টই ছাড় করা যায় না।

naruda


এ কারণেই অনেক কারখানায় বায়িং কিউসিদের আপ্যায়নের বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়। কোথাও কোথাও তাদের এমনভাবে আপ্যায়ন করা হয়, যেন তারা বিশেষ অতিথি। অবশ্য সবাই এক রকম নন। অনেক কিউসি অত্যন্ত ভদ্র, পেশাদার ও সহযোগিতাপরায়ণ। আবার কিছু মানুষ আছেন, যারা ক্ষমতার অবস্থানে থেকে কখনো কখনো আচরণের সীমা ভুলে যান।


সেদিন নাড়ুদা তার অফিসের একটি ঘটনা শোনাল।


দুপুরের খাবারের সময় অন্য সবার চেয়ে একটু দেরিতে ডাইনিংয়ে গিয়েছিল সে। একা বসে খাচ্ছে। এমন সময় অফিস বয় মিলন হন্তদন্ত হয়ে এসে বলল,


—স্যার, লেবুর খোসা আছে নাকি?


নাড়ুদা অবাক হলেও খুব একটা গুরুত্ব দিল না।


—হ্যাঁ, টেবিলে রেখেছি। কিন্তু লেবুর খোসা দিয়ে কী করবে?


—একটু দরকার ছিল স্যার। পরে এসে বলছি।


বলেই মিলন দ্রুত চলে গেল।


নাড়ুদা ভেবে পেল না, খাওয়া শেষ হওয়ার পর ফেলে দেওয়া লেবুর খোসা আবার কার কী কাজে লাগতে পারে!


কিছুক্ষণ পরে মিলন ফিরে এল।


মুখে এক ধরনের অসহায় ভাব।


সে নিজেই বলতে শুরু করল,


—কি করব স্যার? আমরা ছোট পোস্টে চাকরি করি। আর তারা হলেন জামাই মানুষ। যখন যা চাইবেন, তখনই দিতে হবে।


নাড়ুদা হেসে বলল,


—কী হয়েছে, খুলে বলো।


মিলন বলল,


—একজন বায়িং কিউসি এখনই লেবু চা চাইছিলেন। আমি বললাম, ক্যান্টিনে এই মুহূর্তে লেবু নেই। একটু সময় দিলে বাজার থেকে এনে বানিয়ে দিচ্ছি। কিন্তু তিনি শুনতেই রাজি নন। এখনই লাগবে। না হলে ম্যানেজারের কাছে অভিযোগ করবেন।


নাড়ুদা জিজ্ঞেস করল,


—তারপর?


মিলন মাথা নিচু করে বলল,


—তাই আপনার টেবিল থেকে লেবুর খোসা নিয়ে গিয়ে চায়ের মধ্যে দিয়ে দিলাম। লেবুর গন্ধও হলো, চাও তৈরি হয়ে গেল।


কথা শুনে নাড়ুদা প্রায় চমকে উঠল।


—কি বলো! এটা ঠিক করলে?


মিলন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,


—ঠিক-ভুল জানি না স্যার। কিন্তু চাকরি হারানোর ভয় তো আমারও আছে। কিছু মানুষ এমনভাবে কথা বলে, যেন আমরা মানুষ নই, মেশিন। একটু সময় দিতেও রাজি না। অথচ একটু অপেক্ষা করলেই ভালো জিনিস পেতেন।


নাড়ুদা চুপ করে রইল।


মিলনের কাজ সমর্থন করার মতো নয়। কিন্তু তার কথার মধ্যে একটি বাস্তবতাও লুকিয়ে ছিল।


আমরা অনেক সময় ভুলে যাই, আমাদের কাজের পেছনে আরও অনেক মানুষের শ্রম জড়িয়ে আছে।


অফিস বয়, ড্রাইভার, নিরাপত্তাকর্মী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, রান্নার লোক কিংবা পিয়ন—তাদের প্রত্যেকেরই নিজস্ব দায়িত্ব ও গুরুত্ব আছে।


তাদের প্রতি সম্মান দেখানো শুধু ভদ্রতা নয়, এটি পেশাদারিত্বেরও অংশ।


ক্ষমতা থাকলেই যে কাউকে তাড়াহুড়া করানো যাবে, অযথা চাপ দেওয়া যাবে কিংবা অসম্মান করা যাবে—এমন ধারণা কখনোই সঠিক নয়।


কারণ বাস্তবতা হলো, মানুষকে সম্মান দিলে মানুষও সম্মান ফিরিয়ে দেয়।


আর অসম্মান করলে?


কখনো কখনো তার ফলও অপ্রত্যাশিতভাবে ফিরে আসে।


সেদিন যদি সেই কিউসি ভদ্রভাবে বলতেন,


—ঠিক আছে, সময় নিয়ে নিয়ে আসুন।


তাহলে হয়তো তিনি একটি সতেজ, টাটকা লেবু চা খেতেন।


কিন্তু অধৈর্য আচরণের কারণে তিনি বুঝতেই পারলেন না, তার কাপে থাকা লেবুর সুবাস আসলে অন্য কারও ফেলে দেওয়া খোসা থেকে এসেছে।


জীবনের অনেক ক্ষেত্রেও এমনটাই ঘটে।


আমরা ক্ষমতার জোরে কাজ আদায় করতে চাই, কিন্তু সম্মানের মাধ্যমে কাজ আদায় করার শক্তিকে অবহেলা করি।


অথচ দীর্ঘমেয়াদে মানুষের ভালোবাসা, সহযোগিতা ও আন্তরিকতা—এসবই সবচেয়ে বড় সম্পদ।


নাড়ুদা গল্প শেষ করে বলল,


—মানুষকে ছোট ভেবো না। যে মানুষটাকে আজ তুমি গুরুত্ব দিচ্ছ না, কাল হয়তো তার ওপরই তোমার প্রয়োজন নির্ভর করবে।


আমি মনে মনে ভাবলাম, সত্যিই তো।


ক্ষমতা দিয়ে ভয় দেখানো যায়, কিন্তু সম্মান অর্জন করা যায় না।


সম্মান অর্জন করতে হয় আচরণ দিয়ে।


আর অনেক সময় একটি কাপ চায়ের মধ্যেই জীবনের বড় শিক্ষা লুকিয়ে থাকে।


No comments:

Post a Comment

Post Bottom Ad

Pages