হরে কৃষ্ণ নামযজ্ঞ ও সনাতনী সমাজ : ঘুম ভাঙার আহ্বান
ইদানীং অনেক এলাকার মতো আমাদের সমাজেও ঘন ঘন হরে কৃষ্ণ নামযজ্ঞ, নামসংকীর্তন বা অনুরূপ ধর্মীয় আসর বসছে। দিনে জনসমাগম তুলনামূলক কম হলেও সন্ধ্যা নামতেই সেখানে মানুষের ঢল নামে। তবে এ ভিড়ের উদ্দেশ্য সব সময় ধর্মচর্চা নয়—অনেকেই সেখানে যান বিনোদনের আশায়, পরিচিতদের সঙ্গে আড্ডা দিতে কিংবা পরিবেশের আমেজে কিছু সময় কাটাতে। ফলে যে উদ্দেশ্যে এই নামযজ্ঞের আয়োজনে মানুষের সমাগম প্রত্যাশিত ছিল, বাস্তবে তার বেশির ভাগই অনুপস্থিত।
প্রশ্ন দাঁড়ায়—হরে কৃষ্ণ নামযজ্ঞ থেকে সনাতনী হিন্দুরা কি সত্যিই আধ্যাত্মিক বা জ্ঞানগত কোনো উপকার পাচ্ছে? অনেকের মতে—না। কীর্তনের সুর শোনা, কিছুক্ষণ গোল হয়ে নৃত্য করা, বা ধর্মীয় আবহে উপস্থিত থাকা—এসব এক ধরনের মানসিক প্রশান্তি দিলেও বেদ, উপনিষদ, গীতা, ধর্মশাস্ত্র–এসব গভীর জ্ঞানভাণ্ডারের তুলনায় তা অগভীর। পরম্পরাগত দর্শনের যে মূল শক্তি, আত্মজিজ্ঞাসার যে প্রাচীন সুরা—সেগুলো আজ আমরা নিজেদের হাতেই বিস্মৃত করছি।
সনাতন ধর্ম শুধু নামগান বা আচারানুষ্ঠান নয়; বরং এক বিশাল দার্শনিক মহাসমুদ্র, যেখানে মানবচিন্তা, নৈতিকতা, মন, ঈশ্বর, জগতের রহস্য—সবকিছুর গভীর অনুসন্ধান রয়েছে। উপনিষদের “তৎ ত্বম অসি”, গীতার কর্মযোগ-ভক্তিযোগ-জ্ঞানযোগ, বেদের ঋষিদের ঔদার্য—এসব জ্ঞান আজও মানবসভ্যতাকে পথ দেখাতে সক্ষম। কিন্তু দুর্ভাগ্য, আমরা নিজেদের মূল শিকড় ভুলে বাহুল্য আচারকে প্রকৃত ধর্মজ্ঞান ভেবে বসেছি।
এর মানে এই নয় যে নামযজ্ঞের কোনো মূল্য নেই। নামসংকীর্তন ভক্তিভাব জাগাতে, ঈশ্বরস্মরণকে সহজ করতে এবং সাধারণ মানুষের মন শান্ত করতে অনেককাল থেকেই কার্যকর একটি উপায়। কিন্তু সেটি যদি জ্ঞানচর্চার পরিপূরক না হয়ে মানুষের সময় কাটানোর একটি উৎসবে পরিণত হয়, তবে প্রকৃত সনাতনী মূল্যবোধ সেখানে উপেক্ষিতই থেকে যায়।
আজ প্রয়োজন ছিল—
বেদ-উপনিষদ আলোচনা সভা,
গীতা পাঠ ও তার ব্যাখ্যা,
নৈতিক-আদর্শভিত্তিক শাস্ত্রচর্চা,
শাস্ত্রজ্ঞদের বক্তৃতা,
তরুণদের জন্য সনাতনী দর্শনের উপর কর্মশালা,
সমাজ ও আধ্যাত্মিকতার সমন্বিত আলোচনা।
এসব আয়োজন সনাতনী সমাজকে শুধু সাংস্কৃতিকভাবে নয়, বোধগতভাবে শক্তিশালী করে তুলতে পারত। মানুষের মন ও বুদ্ধিতে যে আলোর সঞ্চার প্রয়োজন, তা কেবল জ্ঞান থেকেই আসে। ভক্তি ও আনন্দের প্রবাহ গুরুত্বপূর্ণ, তবে সেই প্রবাহকে সঠিক দিক নির্দেশ করতে জ্ঞানই হলো ঢাল-তলোয়ার।
দুর্ভাগ্য, সনাতনী সমাজের বড় অংশ এখনো এই প্রয়োজন অনুভব করে না। অনেকে আচারেই সন্তুষ্ট, অনুসন্ধিৎসা হারিয়ে ফেলেছে, প্রশ্ন করতে ভয় পায়; আবার কেউ কেউ মনে করে কীর্তনই সবকিছু। ফলে জ্ঞানের যে সোনালি ভাণ্ডার আমাদের পূর্বপুরুষ রেখে গেছেন, তার দরজা অনেকটাই বন্ধ রয়ে যাচ্ছে।
কিন্তু ঘুম ভাঙতেই হবে।
সংস্কারহীন ধর্মচর্চা নয়, প্রয়োজন বোধন।
অন্ধ আনুগত্য নয়, প্রয়োজন যুক্তিবোধ।
কেবল সুর-সঙ্গীত নয়, প্রয়োজন শাস্ত্রের আলো।
যেদিন সনাতনী সমাজ বুঝতে পারবে যে ধর্ম শুধু গলা ছেড়ে গান করার বিষয় নয়, বরং গভীর জ্ঞান, আত্ম-অনুসন্ধান ও নৈতিকতার উপর দাঁড়ানো এক মহান পথ—সেদিনই প্রকৃত জাগরণ ঘটবে।
সনাতনী জাতির ঘুম ভাঙুক—নিজেদের চিরন্তন জ্ঞানের আলোয়।
সত্য, জ্ঞান ও কল্যাণের পথে নতুন প্রজন্ম এগিয়ে যাক—
এটাই আজকের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।
No comments:
Post a Comment