ফুরফুরে মন মেজাজ নিয়ে অফিস থেকে বাসায় আসলাম । আজ অনেক দিন পর মনে আনন্দ জাগছে । আমার কিছু টাকার সমস্যা ছিল ,গত কাল অফিস থেকে ত্রিশ হাজার টাকা অ্যাডভান্স নিয়েছি , প্রতি মাসে পাঁচ হাজার করে কাটবে বেতন থেকে । ব্র্যাক থেকে লোন নিয়েছিলাম ,গত মাসে পরিশোধ হয়েছে ,এখন শুধু আশা সমিতির কিস্তি দেই মাসে আট হাজার । তার উপর আজ বেতন পেয়েছি ,সব মিলিয়ে মনটা আজ অনেক ভাল ।
সাড়ে আটটায় ভাতিজা সুপ্রিয় মেসেজ দিয়েছে ,আমি দেখিনি ,যখন সে কল দিল তখন দেখলাম ," কাকু বড় বড় শিলা পড়ছে , এমন শিলা বৃষ্টি জীবনে প্রথম দেখলাম । আমাদের ঘর পড়ে গেছে তুমি কল দাও ।"
তার কল কেটে দিয়ে কল দিলাম , কল যায় না । বার বার কল দিচ্ছি কিন্তু কল যায় না । দাদার মোবাইলে কল দিলাম একই অবস্থা । পাশের বাড়ির ভাতিজা পলাশের মোবাইলে কল দিয়ে দেখলাম ,কল ঢোকে না । ভাবলাম ,শিলা বৃষ্টির সাথে ঘর পড়ে যাওয়ার কি সম্পর্ক ,নিশ্চয় কিছু একটা ঘটেছে ।
মনটা অজানা আশংকায় ভরে গেল , কথা না বলা পর্যন্ত শান্তি পাচ্ছি না । নয়টার দিকে দাদা কল দিয়ে জানাল , ঝড়ে দাদার ঘরের পিছনের আমলকি গাছটা ঘরের উপর পড়ে গিয়ে দশ এগারোটা পিলার ভেঙ্গে গেছে । বাগানের সুপারি,লিচু সহ অনেক গাছ ভেঙে গেছে । ধান,পাট সহ অন্যান্য ফসল সব নষ্ট হয়ে গেছে । চারিদিকে শুধু হাহাকার ,আর্তনাদ ।
শুনে নিমিষেই সব আনন্দ পালিয়ে গেল ,বিষাদে ভরে গেল হৃদয় ।স্বপ্ন গুলো যেন ঝরে গেল ।
কি ভাবলাম আর কি হল , কিছুই বুঝতে পারছিনা কি হবে ভবিষ্যতে । সান্ত্বনা শুধু একটাই ,এর চেয়ে বেশি খারাপ কিছু হতে পারত ,বৌদি ঝড়ের সময় ঐ ঘরেই ছিল ,ভাগ্য ভাল তার কিছু হয়নি । এটুকুই সান্ত্বনা ।
রাতে ঘুম আর আসে না । বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপনের কথা আছে আজ , তাই জেগে জেগে টিভি দেখছি । চোখ টিভির পর্দায় থাকলেও মনে চলছে বিষাদের ঝড় । প্লান গুলো ধুলোয় ঝরে গেল , জানি না , কি হবে ।
ঝড়ে বাগানের আমলকি গাছটা ঘরের উপর পড়ে কি অবস্থা হয়েছে । ভাগ্যটা ভাল ঐ মুহূর্তে বৌদি ছিল ঘরের মধ্যে তার পরেও কিছু হয় নি ,খারাপ কিছু একটা হতে পারতো ।
পুকুরের ধারে যে লিচু গাছটা ছিল সেটা ভেঙ্গে গিয়েছে । বাগানে তিনটা লিচু গাছ ,সব গুলো বাবার হাতের লাগানো । বাবা নেই, তার স্মৃতি গুলোও ধীরে ধীরে নষ্ট হতে চলছে । একটা গাছ বড় হতে অনেক সময় লাগে কিন্তু নিমিষেই ভেঙ্গে যায় । মানুষের জীবনটাও ওরকম । সাজানো জীবন এলোমেলো হতে বেশি সময় লাগে না । নিমিষেই সব কিছু ছারখার হয়ে যায় । কিছু বেদনা রয়ে যায় ।
বাগানের ভিতরের দিকেও একটা লিচু গাছ রয়েছে । ঝড়ের দাপটে সেই গাছটাও ভেঙ্গে গেছে । ভাঙ্গা গাছের ছবি দেখে মনটা খারাপ হয়ে গেল । একে একে বাগানের বড় বড় গাছ গুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে , সেই সাথে স্মৃতি গুলোও যেন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে । ছোট বেলায় বাগানের এক একটা গাছের সাথে আমাদের কি সখ্যতাই না ছিল ,ধীরে ধীরে সেই বাঁধন গুলো যেন আলগা হয়ে যাচ্ছে । বাগানে একটা সময় ছিল অনেক গাছ পালা ছিল । কত রকমের ফলের গাছ ,কত রকম ফল । মনে পড়লে সেই সব দিন বুকের ভেতরটা যেন কেমন করে ওঠে । আর কোন দিনও আর ফিরে পাব না । শুধু স্মৃতি হয়ে থাকবে ।
বাগানের আমলকি গাছটা ঘরের উপর এমন ভাবে পড়েছে ,ঘরের কোণটা দুমড়ে মুঝড়ে গেছে । গাছটাতে অনেক বড় বড় আমলকি ধরতো । পাড়ার ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা আমলকি কুড়ানোর জন্য বাগানে আসতো । আর কোন দিন কেউ আমলকি কুড়াতে আর আসবে না কেন না গাছটাই তো আর থাকলো না । ঝড় যখন আসে তখন সব কিছু লন্ড ভন্ড করে দেয় । কোন কিছুই আর আস্ত রাখে না । ঝড় চলে যাওয়ার সময় রেখে যায় কিছু স্মৃতি চিহ্ন কিছু ক্ষত চিহ্ন , মনের মাঝে বিধেঁ থাকে অনেক ।
শিলা বৃষ্টির প্রকোপে ধান ক্ষেতের ধান নষ্ট হয়ে গেছে । আর কয়েক দিন পরেই সেই ধান উঠতো কৃষকের গোলায় । শিলা বৃষ্টি কৃষকের চোখের সব স্বপ্ন যেন নিমিষেই ভেঙ্গে দিল । এক জন কৃষক তার ফসল কে নিয়ে কতই না স্বপ্ন দ্যাখে ,আর সেই স্বপ্ন ভাঙতে কোন সময় লাগে না । সোনালী ধান মাটিতে ঝরে পড়েছে কঠিন শিলার আঘাতে । কৃষকের বুকে শিলা দিয়েছে অনেক বড় আঘাত । ফসল ফলাতে যত কষ্ট ,কৃষি কাজে যারা জড়িত শুধু মাত্র তারাই জানে । সেই ফসল যদি এমন করে নষ্ট হয়ে যায় ,এর চেয়ে দুঃখ,এর চেয়ে কষ্ট আর হয় না । কৃৃষক যখন ফসল বোনে ,তখন অনেক আশা আর স্বপ্ন থাকে তাদের চোখে আর মনে । ক্ষেতের ফসল কৃষকের কাছে নিজের সন্তানের চেয়ে কোন অংশেই কম নয় ।
শিলার কঠিন আঘাত থেকে রক্ষা পায় নি কচু ক্ষেতও । শিলার আঘাতে লন্ড ভন্ড হয়ে গেছে কচু ক্ষেত । কচু ডাটা গুলো শিলার আঘাতে ছিন্ন ভিন্ন হয়ে গেছে । ন্যাড়া মাথা নিয়ে গাছ গুলো দাঁড়িয়ে রয়েছে কালের সাক্ষী হয়ে । বেদনার সাক্ষী দিতে গাছ গুলো দাঁড়িয়ে রয়েছে । এযেন ইতিহাসের স্বাক্ষী ।
শিলার কঠিন আঘাতে ধান গাছ গুলো ্ছিন্ন ভিন্ন হয়ে পড়ে রয়েছে । গাছ গুলোর মেরুদন্ড যেন কেউ হাত দিয়ে ভেঙ্গে দিয়েছে । ধান গাছের সাথে সাথে কৃষকের স্বপ্নও ভেঙ্গে গেছে । এই ধান কে নিয়ে মানুষ কতই না স্বপ্ন দেখতো ,সে স্বপ্ন আজ নিমিষেই শেষ । ্একটা ফসল ফলাতে কৃষককে কত কষ্ট করতে হয় , কত পরিশ্রম করতে হয়,হাড় ভাঙ্গা খাটুনি , কত ঘাম ঝরাতে হয় । সেই পরিশ্রমের আর কষ্টের ফসল যদি নিমিষেই নষ্ট হয়ে যায় ,এর চেয়ে দুঃখের আর কি হতে পারে ।শুধু বেদনাই থেকে যায় ।
ঝড় আর কঠির শিলার আঘাতে কোন ফসলই রক্ষা পায় নি । মরিচ ক্ষেত,সবজি ক্ষেত সব কিছু শেষ হয়ে গেছে । চারিদিকে যেন কৃষকের হাহাকার ,বুক ফাঁটা কাঁন্না আর অব্যাক্ত বেদনায় আকাশ ,বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে । সবাই যেন বোবা হয়ে গেছে ,কারো মুখে কোন কথা নেই , ফসল হারিয়ে তারা যেন নিরব -নিথর হয়ে গেছে । এত দিনের পরিশ্রম ,এতদিনের মূলধন সব যেন শেষ হয়ে গেছে । সামনের দিনের চিন্তায় সবাই যেন দিশেহারা । প্রকৃতির এমন আঘাতে বুকে যেন শুল বেঁধেছে ,কিছুই করার নেই । কৃষকের কাছে তার ফসল সন্তানের চেয়ে কোন অংশেই কম নয় । সেই সন্তান যদি অকালে নষ্ট হয়ে যায় ,এর চেয়ে দুঃখের আর কি হতে পারে । এর চেয়ে কষ্টের আর কি হতে পারে ।
আমি চেষ্ঠা করেছি সময় কে ধারণ করতে ,চেষ্ঠা করেছি কিছু খন্ড চিত্র তুলে ধরতে । কিছু কিছু সময়ের স্মৃতি মনের মাঝে গেঁথে থাকে অনেক দিন ধরে । সময়ের আবর্নে কত কিছুই বদলে যায় ,কত কিছু হারিয়ে যায় ,হারায় না কিছু কিছু স্মৃতি । হয়তো হঠাৎ করে কোন এক সময়ে মনে পড়ে যায় অতীতের ঘটে যাওয়া কোন ঘটনার কথা । কিছু কিছু ঘটনার কথা স্মরণ করে হয়তো মানুষ আবেগে আপ্লুত হয়ে যায় । ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছেও কিছু দলিল রেখে যাওয়া যায় । মানুষ চিরদিন এক রকম থাকে না । কিশোর থেকে নবীন,নবীন থেকে প্রবীণ ,এভাবেই জীবন এগিয়ে চলে । মানুষের হৃদয়ে কিছু কিছু স্মৃতি ধ্রুব তারার মত উজ্জল হয়ে থাকে ,তেমনি আমিও চেষ্ঠা করেছি সময় কে ধরে রাখতে । ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেন এই সব দিনের কথা জানতে পারে । বুঝতে পারে অতিত উতিহাস । তাদের প্রয়োজনে আমি করি লেখা লেখি । আমার ক্ষুদ্র প্রচেষ্ঠায় যা পারি,তাই দিয়ে তুলে ধরতে চাই সময় এর খন্ড চিত্র । অনেক সময় ইতিহাস আপনাআপনি তার পরিচয় তুলে ধরে । সে জন্য ইতিহাস লেখার দরকার । কেউ ইতিহাস লিখে রাখে আর কেউ ইতিহাস পড়ে অতিত কে জানতে চায় । আমাদের উচিৎ বর্তমানকে ভবিষ্যতের জন্য সংরক্ষণ করা ।
একদিন আমরা দুনিয়াতে থাকব না ,থাকবে শুধু আমাদের লিখিত দলিল গুলো ।
একদিন আমরা দুনিয়াতে থাকব না ,থাকবে শুধু আমাদের লিখিত দলিল গুলো ।





No comments:
Post a Comment