বাংলা নববর্ষ মানেই বাঙালির কাছে অন্যরকম একটা উৎসব । নব বর্ষকে ঘিরে এক মাস আগে থেকেই চলে কত প্লান ,পরিকল্পনা । কে কি কিনবে,কোথায় কি অনুষ্ঠান হবে,কোথায় ঘুরতে যাওয়া হবে , কত ধরনের খাওয়ার আইটেম থাকবে এসব নিয়ে চলে আলোচনা । এক মাস আগে থেকেই গান ,বাজনার মহরা,নাটকের রিহার্সাল । কোন মাঠে মেলা বসবে,কোন মাঠে সার্কাস বসবে ,কোথায় নাগরদোলা বসবে,কোথায় চড়কের মেলা হবে,কোথায় যাত্রা পালা হবে এসব নিয়ে চলে গল্প ।
বাংলা নব বর্ষ জাতি,ধর্ম,বর্ণ নির্বিশেষে সবার কাছে বড়ই আনন্দের,খুবই খুশির একটা উৎসব । বাঙালির যত গুলো ঐতিহ্যবাহী উৎসব রয়েছে বাংলা নব বর্ষ সেগুলোর মধ্যে অন্যতম ।
বাংলা নব বর্ষে আর একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন হয় ,সেটা হল ব্যবসায়িদের শুভ হালখাতা । যদিও আজকের দিনে হালখাতার প্রচলনটা আগের চেয়ে অনেক কম ।
ছোট বেলায় আমরা নব নবর্ষে কত কিছুই করতাম । চৈত্র সংক্রান্তির দিনে সকালে উঠে আমরা শিকারে যেতাম । দল বেঁধে ছেলেরা যেতাম বাঁশ ঝাড়ে বা ছোট খাটো বন বাদারে । সবার সাথে থাকতো লাঠি,বল্লম,তীর,ধনুক । কারো হাতে দা,কোদাল । আমরা তো সাঁওতাল নই ,তারপরেও কেন যেন বছরের পর বছর এমন করে যেতাম সেটা আজও আমার কাছে বোধগম্য নয় । ছোট বেলা থেকেই দেখে এসেছিলাম তাই আমরাও যেতাম ।
বড়দের অনেকের কাছে শুনেছিলাম ,আমরা নাকি রাজবংশী । আগে রাজারা দল বেঁধে শিকার করতো । তাদের সেই ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্যই নাকি আমাদের এলাকায় প্রতি বছর চৈত্র সংক্রান্তির দিন এলাকার ছেলেরা শিকার করার জন্য বের হয় । দুপুর পর্যন্ত বা দুপুরের আগেই শেষ হত শিকার পর্ব । রাজারা শিকার করতো হরিণ,বাঘ আর আমরা মারতাম খেকশিয়াল,সজারু,বন বিড়াল ,শিয়াল,কাঠ বিড়াল । আমি ভেবে পাই না আমরা কিভাবে রাজার সাথে সম্পৃক্ত হলাম ।
আমাদের বংশের বা এলাকার তো কেউ কখনো রাজা ছিল না । স্থানীয় ভাষায় আমরা এটাকে শিয়াল পিটা (তাড়ানো ) বলতাম । আমার মনে হয় এলাকার লোক শিয়ালের হাত থেকে হাঁস,মুরগী ,ছাগল ছানাকে রক্ষা করার জন্য শিয়ালকে তাড়াতে এই কাজটি করতেন । শিকার থেকে ফিরে এসে হাত মুখে ধুয়ে তিতা খেতাম । তিতা হল ভাজা চাউল । ঠাকুরমা চাউল এমন ভাবে ভাজতো তা একেবারে পুরে যাওয়ার মত হত । সাদা চাউল হয়ে যেত কালো বর্ণের । আমাদের এলাকার লোক মনে করতো চৈত্র সংক্রান্তির দিনে এমন চাউল ভাজা খালি পেটে খেলে সারা বছর আর কৃমি হবে না । ইচ্ছায় হোক আর অনিচ্ছায় হোক সেই পুরে যাওয়া কালো রঙের তিতা চাউল ভাজা খেতাম । এর পর নানা রকমের ভর্তা দিয়ে পান্তা ভাত খেতাম । তারপর খেতাম টক দই দিয়ে চিড়া । দুপুরে স্নান করে নানা রকম ভাজা জাতীয় খাবার খেতাম ।
আমাদের বংশের বা এলাকার তো কেউ কখনো রাজা ছিল না । স্থানীয় ভাষায় আমরা এটাকে শিয়াল পিটা (তাড়ানো ) বলতাম । আমার মনে হয় এলাকার লোক শিয়ালের হাত থেকে হাঁস,মুরগী ,ছাগল ছানাকে রক্ষা করার জন্য শিয়ালকে তাড়াতে এই কাজটি করতেন । শিকার থেকে ফিরে এসে হাত মুখে ধুয়ে তিতা খেতাম । তিতা হল ভাজা চাউল । ঠাকুরমা চাউল এমন ভাবে ভাজতো তা একেবারে পুরে যাওয়ার মত হত । সাদা চাউল হয়ে যেত কালো বর্ণের । আমাদের এলাকার লোক মনে করতো চৈত্র সংক্রান্তির দিনে এমন চাউল ভাজা খালি পেটে খেলে সারা বছর আর কৃমি হবে না । ইচ্ছায় হোক আর অনিচ্ছায় হোক সেই পুরে যাওয়া কালো রঙের তিতা চাউল ভাজা খেতাম । এর পর নানা রকমের ভর্তা দিয়ে পান্তা ভাত খেতাম । তারপর খেতাম টক দই দিয়ে চিড়া । দুপুরে স্নান করে নানা রকম ভাজা জাতীয় খাবার খেতাম ।
চাউল ভাজা ,গম ভাজা,ভুট্টা ভাজা, শিমের বিচি ভাজা,অরহর কলাই ভাজা,চিড়া ভাজা,বুট ভাজা,ছোলা রান্না কত কিছুই না খাওয়া হত । দুপুরে পাঁঠার মাংস বা খাসির মাংস,বিভিন্ন প্রকার মাছ দিয়ে হত দুপুরের আহার । বিকালে যেতাম চড়ক এর মেলা । চড়ক পূজায় চড়ক ঘোরানো হত । এভাবেই কাটাতাম ছোট বেলার নব বর্ষ এর দিন গুলো । বিভিন্ন জায়গায় যাত্রা শুনতেও যেতাম ।
চড়ক পুজা হওয়ার এক মাস বা পনের দিন আগে থেকেই এলাকায় শুরু হত গমিরা গান বা গমিরা খেলা। এক জন ঢাকী ঢাক বাজায় আর সাত,নয় বা এগারো জন গায়ক সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে গান গায় এবং সাথে সাথে নৃত্য করে । কেউ কেউ শিব, পার্বতী সেজে নেচে নেচে নেচে মাগন করতো ।
চড়ক পুজার পর চড়ক ঘোরানো হত । এরপর আগুন খেলা হত । এক লম্বা আয়তাকার গর্তের মাঝে কাঠ পুড়িয়ে আগুন রাখা হত । সেই আগুনে লোক জন খালি পায়ে হেটে যেত । কারো পা পুড়তো না । যারা দেখেন নি তারা হয়তো বিশ্বাস নাও করতে পারেন তবে খোঁজ নিয়ে দেখতে পারেন ।
বিভিন্ন স্থানে ভিন্ন ভিন্ন দিনে মেলা বসতো । আমরা যেতাম মেলায় । মেলায় গুঠি খেলা,কাঁটা খেলা সহ নানা রকম খেলা বসতো । শখের বসে আমরা দুই একটা খেলা খেলতাম ।
পহেলা বৈশাখ থেকে আমাদের এলাকায় প্রায় প্রতিটা বাড়িতে নিরামিষ খাওয়া শুরু হতো । পাড়ার প্রতিটা মন্দিরে সকালে অথবা সন্ধ্যায় কির্তন,গীতা,ভাগবদ পাঠ হতো । তুলসীর পাটে তুলসী গাছে প্রতিটা হিন্দু বাড়িতে ঘট বেঁধে দেওয়া হতো । একটা ঘটির নিচের দিকে ছোট একটা ছিদ্র করে দিয়ে ভিতরে বালু আর কিছু দূর্বাঘাস দেওয়া হত । দূর্বা ঘাসের কুশি গুলো ছিদ্র দিয়ে বের করে দেওয়া হয় । বাঁশের খুঁটির সাথে এমন ভাবে ঘটি টাকে বাঁধা হয় যেন দূর্বা ঘাসের কুশি গুলো তুলসীর ঠিক মাথার উপরে থাকে ।
এরপর ঘটিতে জল দেওয়া হয় । সেই জল ধীরে ধীরে দূর্বার কুশি দিয়ে তুলসীর মাথায় পড়ে । তার পর সেই জল তুলসীর গা বেয়ে গোড়ায় পড়ে । মূলত তুলসী গাছ কে বৈশাখের খরা থেকে বাঁচাতেই এমন পদ্ধতি । ধীরে ধীরে জল ঝরে বলে আমাদের এলাকায় এটাকে ঝরা বাঁধা ও বলে ।
যখন বড় হলাম ,দেখলাম শহুরে মানুষ বাংলা নব বর্ষকে অন্য ভাবে পালন করে । আমরা কয়েক জন মিলে ২০০৬ কিংবা ২০০৭ সালের দিকে শুরু করলাম এলাকায় শহরের মত করে পহেলা বৈশাখ উৎযাপন ।
সকালে রেলী করতাম,দুপুরে নানা রকম প্রতিযোগীতা হতো,বিকালে লাঠি খেলা আর অনেক রাত অবধী চলতো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ।
আমরা চালু করলাম প্রথম পহেলা বৈশাখ উৎযাপন । এলাকার মানুষ দেখলো বৈশাখের পোশাক । তারা আগে জানতো না যে ,পহেলা বৈশাখের শাড়ি,ফতুয়া বা পাঞ্জাবী কি রকম করে পড়ে । দেশ এবং দেশের বাইরে বাংলা নব বর্ষ মানেই বাঙালির মিলন মেলা । বিদেশীরা পর্যন্ত পহেলা বৈশাখের পোশাক পরে বাঙালি সাঁজার চেষ্ঠা করে ।
ঢাকায় রমনা বটমূলে মহা সমারোহে উৎযাপন হয় বাংলা নব বর্ষ । মঙ্গল শোভা যাত্রা মানেই সেই রকম ব্যাপার সেপার । বাংলা নববর্ষ কে কেন্দ্র করে দেশে বানিজ্যের প্রসার ঘটে । কোটি কোটি টাকার ব্যবসা হয় । বৈশাখ মাস ব্যাপি চলে বাংলা নববর্ষের বিভিন্ন অনুষ্ঠান । দেশের ঐতিহ্যবাহি উৎসব গুলোর মধ্যে অন্যতম উৎসব হল বাংলা নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ উৎযাপন ।
এবার হঠাৎ করে যেন সব কিছু বন্ধ হয়ে গেল । করোনা নামক এক ভাইরাস এসে সারা বিশ্বকে নিস্তব্ধ করে দিল । বাংলাদেশে প্রথম করোনা আক্রান্ত রোগী পাওয়া যায় ৮ ই মার্চ ,২০২০ ইং । সেই যে শুরু হল,দিনকে দিন আক্রান্তের সংখ্যা শুধু বেড়েই চলছে । এপ্রিল মাসের ১৪ তারিখে পালন করা হয় পহেলা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষ । এবার সরকার থেকে সব কিছু বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে । শত শত বছরের ঐতিহ্য এবার বন্ধ হয়ে গেল ,পালন করা হল না ।
মানুষ এখন বাঁচার জন্য লড়াই করছে করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে । বেঁচে থাকলে আবারো নতুন করে সবকিছু শুরু করা যাবে । মানুষের প্রধান কাজ হচ্ছে এখন করোনাকে পরাজিত করা । এক অদৃশ্য ভাইরাসের ভয়ে ভীত মানব জাতি । এত দিন কত গর্বই না করতো মানুষ ! মানুষ হল সৃষ্টির সেরা জীব । কত কিছুই করতে পারে মানুষ । চাঁদের বুকে এঁকে দিয়েছে পদচিহ্ন । মঙ্গল গ্রহে যাওয়ার জন্য চলছে অভিযান ।
এমনকি মঙ্গলে জায়গা জমি বিক্রির ঘোষণাও দিয়েছে মানুষ । কিন্তু হঠাৎ করে করোনা এসে যেন সব কিছু বদলে দিল এবং দিচ্ছে । দুনিয়ার ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলো করোনার থাবায় নাজেহাল । হাজারে হাজারে মানুষ মরছে । লাখে লাখে আক্রান্ত হচ্ছে । করোনাকে নিয়ে কত গবেষণা হচ্ছে তবুও কেউ কোন প্রতিষেধক তৈরি করতে পারছে না ।
এবার ঘরোয়া ভাবে যে যার মত বাংলা নববর্ষ পালন করলো । আমি করোনার জন্য সাধারন ছুটিতে বাড়িতে যাই নি । শ্রীপুরেই রয়ে গেছি । উশিনর আর সমলু রয়েছে আমার সাথে । আমাদের সময়টা খুব ভাল ভাবেই কাটছে । সকালে পান্তা,দুই প্রকার ভর্তা আর মাছ ভুনা দিয়ে ভাত খেয়েছি । আমাদের এলাকায় ছেলেরা আগের ন্যায় এবারেও শিকারে গিয়েছিল । বাড়িতে বাড়িতে খাওয়া দাওয়া ভালই চলেছে । শুধু রেলী,গান,বাজনা,চড়ক,মেলা এসব বন্ধ ছিল ।
এবার পহেলা বৈশাখ নিরবেই কেটে গেল ।
জীবনে কখনো কখনো এমন সময় আসে,তখন মানুষের আর কিছুই করার থাকে না ।
এখন চলছে করোনার সময় । সব খানে করোনার কথা,করোনার গল্প । পৃথিবী আবার জেগে উঠবে । আবার হয়তো নতুন করে সব কিছু ঠিক হবে । সব কিছু নতুন ভাবে শুরু হবে । তখন হয়তো হারিয়ে যাবে অনেক চেনা মুখ । হারিয়ে যাবে পরিচিত কত কিছুই । এবার নববর্ষে প্রার্থনা করি,দ্রুত যেন বিশ্বের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যায় । সবাই যেন চেনা পরিবেশে ফিরে যেতে পারে । সামনের বছর যেন নতুন উদ্যামে পহেলা বৈশাখ উৎযাপন করার জন্য বেঁচে থাকি ।

No comments:
Post a Comment