খুব সকালে উঠলাম । আজ নয়টার দিকে রওনা দেব । একটা অটো রিক্সা ভাড়া করা হয়েছে । ববিকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে । তাকে ডাক্তার দেখানোর পর আমি শ্রীপুরে চলে যাব । আমি,ববি,দিলীপ,সুপ্রিয়,উশিনর,সুজন,মধু আর সুনীল নামের একজন ,এই আট জন যাব এক সাথে । আসার সময় ববি,দিলীপ আর সুপ্রিয় আসবে ।
সকালে উঠে ববি বেশ ফুরফুরা মেজাজে রেডি হচ্ছে । বৌদিকে বললাম,বেশি কিছু রান্না করার দরকার নেই । দুরের জার্নি ।
আমি পুকুর পাড়ে টঙের উপর অনেকক্ষন বসে থাকলাম । ভাবলাম অনেক কিছু । এ অবস্থায় ববির পাশে আমার থাকাটা খুবই জরুরী ,কিন্তু থাকতে পারছি না ।
জীবন বড়ই বৈচিত্র্যময় । একদিকে জীবিকা,অন্যদিকে পরিবার । কোনটাকেও এ সময়ে ছাড়তে পারব না । সব কিছুকেই সামলে নিয়ে চলতে হবে ।
নয়টার দিকে রওনা দিলাম । ববি আলুর চপ দিল কিছু । পায়েল দিল কয়েক প্যাকেট বিস্কুট । মা অনেক কিছু নিতে বলল । বাড়ির গাছে লিচু পেকেছে । কিন্তু এমন লক ডাউন পরিস্থিতির জন্য নিলাম না কিছুই । কিভাবে শ্রীপুরে যাব ,সেই চিন্তাটাও মাথায় ঘুরছে ।
অটোতে উঠার সময় পায়েল এসে ববিকে বলল, কাকিমা তুমি আর আসিও না । এ কথা শোনার পর ববির মন খারাপ হয়ে গেল । সে কাঁদতে লাগলো । পায়েল যে মজা করে কথাটা বলল ,সেটা সে বুঝতে পারছে না । ববির হাসি খুশি মুখটা অন্ধকার হয়ে গেল । অবশেষে আমরা রওনা দিলাম ।
অটো ভাদুর দরগা হয়ে ,জলঢাকা দিয়ে গ্রামীন পথে চলতে লাগলো । তিন ঘন্টার পথ চার ঘন্টায় শেষ হল । রংপুর সিও বাজারে অটো থামলো । আমরা ধাপে গেলাম । আমি,ববি,দিলীপ আর সুপ্রিয় গেলাম ডাক্তার জ্যোতির্ময় রায়ের চেম্বারে ।
গিয়ে দেখি ববির সিরিয়াল ২ ,অথচ দিলীপ বলেছিল ৬ । যেতে বলেছিল বারোটায় ,আমরা পৌঁছিলাম একটার পর । ততক্ষণে দশজনের সিরিয়াল অনলাইনে ডাক্তারের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে । ডাক্তার রোগী দেখেন ভিডিও কনফারেন্স এর মাধ্যমে ।
এর পর আবার সিরিয়াল হবে ,তার পর ববিকে দেখবে । ওদিকে আমার আর থাকার সময় নেই । অথচ ববির সাথে থাকাটা অনেক জরুরী ছিল । ইচ্ছে করছে ওদের সাথে থাকি ,কিন্তু বাস্তবতার জন্য সে উপায় নেই । মনটা কেমন যেন করছে , সে অবস্থাটা তুলে ধরতে পারছি না । ওদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ভারাক্রান্ত হৃদয়ে রওনা দিলাম । কষ্ট হলেও বাস্তবতার টানে ছুটে চলতেই হবে ,কিছুই করার নেই ।
রংপুর মডার্ণ মোড়ে এসে দেখি শোচনীয় অবস্থা । দূরপাল্লার কোন গাড়ি চলছে না । চিন্তায় পড়ে গেলাম । ওদিকে আমাদের সাথে যোগ হয়েছে সুজনের এক মামা । যে করেই হোক আমাদের যেতেই হবে ।
অনেকক্ষন দাঁড়ালাম ,গাড়ি পাওয়া যাচ্ছে না । একটা প্রাইভেট কার পাওয়া গেল । ভাড়া চায় দশ হাজার টাকা । চার জন যাওয়া যাবে ।
এরপর কয়েক জন এলেন, ওরা বলল একটা মাইক্রোবাস আসবে , কিন্তু দেরী হবে ,ভাড়া পড়বে দুই হাজার করে ।
এরপর রংপুর কারুপণ্য শিল্প থেকে দুই জন লোক এলেন । ওদের লড়িতে যাওয়া যাবে ,ভাড়া পড়বে জন প্রতি বার শ টাকা করে । ওদের সাথে ওদের কোম্পানীর গেইটে গেলাম । এক ঘন্টা অপেক্ষা করার পর শুনলাম গাড়ি ছাড়বে সন্ধ্যা সাত টায় । মেজাজ খারাপ হয়ে গেল । এখন চারটা বাজে । সময় যেন দ্রুত বয়ে যাচ্ছে । ওদিকে আগামীকাল যে করেই হোক অফিসে উপস্থিত হতেই হবে ।
দিলীপকে কল দিয়ে বার বার খোঁজ খবর নিচ্ছি । এখনও সিরিয়াল পায় নি ।
আমরা পলাশ বাড়ির গাড়িতে উঠলাম । দেখি এভাবে কত দূর পর্যন্ত যাওয়া যায় ।
ছয়টার দিকে দিলীপরা ডাক্তার দেখিয়েছে । এরপর পেসক্রিপশন নিয়ে ওষুধ কিনবে । আমরা পলাশ বাড়িতে নেমে বগুড়ার গাড়িতে উঠলাম । রংপুর থেকে পলাশ বাড়ি পর্যন্ত ভাড়া নিল একশ টাকা । পলাশ বাড়ি থেকে বগুড়া পর্যন্ত একশ টাকা করে ।
আজ একটা নতুন অভিজ্ঞতা হচ্ছে । চলছি অনিশ্চিতের পথে কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছতেই হবে ।
সাতটার দিকে ববিরা রওনা দিয়েছে । আমরা আটটার দিকে একটা ট্রাকে করে গাজীপুরের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম । বগুড়া থেকে চন্দ্রা পর্যন্ত চারশ করে ভাড়া । প্রায় চল্লিশ জনের মত যাত্রী নিয়ে গাদাগাদি করে চলছে ট্রাক ।
মাঝে মাঝে আরও যাত্রী তুলতে চায় ড্রাইভার ,এটা নিয়ে চলছে বাক বিতন্ডা ।
সময় মানুষকে নতুন কিছু শেখায় । আজ অনেক কিছু শিখছি । এতদিন দেখতাম বিশেষ ছুটির সময় মানুষ ট্রেনের ছাদে,ট্রাকের উপড়ে করে বাড়িতে যায় ,আজ নিজেই সেই পথের পথিক ।
ববিরা সাড়ে দশটার দিকে বাড়িতে পৌঁছেছে । আমরা রাত দুইটায় চন্দ্রায় নামলাম । এরপর গাজীপুর চৌরাস্তার বাসে করে রওনা দিলাম ।
মাওনায় পৌঁছালাম তিনটার দিকে । বাসায় এসে ফ্রেশ হয়ে নানা কথা ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম ।
পরের দিন গতানুগতিক নিয়মে আবার কর্মস্থলে যোগদান । আবার রুটিন মাফিক কাজ করা । পিছনে পড়ে রইলো বাড়ির কথা,প্রিয়জনদের কথা । গ্রামের মানুষের কথা । মাঝে মাঝে এমন রুটিন মাফিক জীবন নিজের কাছে বিরক্তিকর মনে হয় । মনে হয় এলাকায় যারা রয়েছে তারা কতই না সুখী ,কতই না শান্তিময় তাদের জীবন । পরিবার,বন্ধু,বান্ধব,আত্মীয় স্বজন নিয়ে তারা কতই না সুখী ।
সব রকম অনুষ্ঠানে তারা উপস্থিত হতে পারছে । আমি চাইলেও যেতে পারছি না ।
এটা কেমন জীবন ? এ জীবনের সার্থকতাই বা কি ?
যারা এলাকায় রয়েছে ,তাদের মুখে শুনি ,আমরা যারা বাড়ির বাইরে রয়েছি ,যারা দু'চার টাকা আয় রোজগার করছি ,আমরাই নাকি ভাল আছি । নিজ অবস্থানে বুঝি কেউ সুখী নয় । তবে আমাকে গ্রাম বার বার ডাকে । বার বার ফিরে যাওয়ার জন্য হাতছানি দেয় ।
আমি প্লান করছি ,গ্রামে গিয়ে কিছু একটা করতেই হবে । গরু পালন,ছাগল পালন,মাছ চাষ এসব করে নতুন ভাবে জীবন শুরু করতে হবে । এমন করে বাড়ি আর কর্মস্থলে ছোটাছুটি না করে নিজে উদ্যোক্তা হয়ে কিছু একটা করা ভাল ।
আজ ববি অসুস্থ থাকা সত্বেও তাকে সময় দিতে পারছি না । এটা বড়ই কষ্টকর । এজন্য উদ্যোক্তা হওয়া ছাড়া বিকল্প আর উপায় নেই ।
যত দিন কিছু একটা করতে পারছি না,ততদিন এভাবেই থাকা ছাড়া কি ই বা করার আছে ।
No comments:
Post a Comment